স্বাধীনতার গৌরব থেকে বামপন্থীদের বাদ দেয়া যাবে না : রাশেদ খান মেনন

Spread the love
  1. স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা,

ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০: “স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা ‘কার খালু’ ছিল না। তারা স্বাধীনতা ও মুক্তির লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। প্রথম স্বাধীনতার সাহসী উচ্চারণ করেছে। একথা ধ্রুবতারার মতো সত্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা দিয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়ে তাকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছেন। তবে এর সাথে বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের স্বপ্ন ঘাম, অশ্রু আর রক্ত জড়িয়ে আছে। কিছু বামপন্থীর ভুলের জন্য স্বাধীনতার গৌরব থেকে বামপন্থীদের বাদ দেয়া যাবে না। তা’হলে যারা ছাপান্নতে ’৯৮ ভাগ স্বায়ত্ত্বশাসন অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করেছিল, পূর্ব বাংলার উপর সংখ্যাসাম্যের নীতি চাপিয়ে দিয়েছিল ইতিহাসে তাদের স্থান কোথায় হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সকল উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। এ গৌরব সবারই।”
২২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় তোপখানা রোডস্থ বিএমএ ভবনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা ঘোষণার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আয়োজিত “স্বাধীনতা জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা ঘোষণা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ” শীর্ষক আলোচনায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি একথা বলেন।
উল্লেখ্য ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত একুশে ফেব্রুয়ারির জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ঘোষণা ও তার ১১ দফা কর্মসূচি উত্থাপিত করায় এহিয়ার সামরিক আদালত রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফরকে সাত বছর সশ্রম কারাদন্ড ও তাদের সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্ত করার ও মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুবুল্লাহ-কে এক বছর সাজা প্রদান করে।
মেনন বলেন, স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু জনগণতন্ত্র দূরে থাক, একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তাই বলে জনগণতন্ত্রের স্বপ্ন, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন মিথ্যা হয়ে যায়নি। আজ না হোক ভবিষ্যতে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়বোই। ৫০ বছরে এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা এমপি’র সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) তৎকালীন সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার, শামসুল হুদা, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল। সঞ্চালনা করেন পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা মহানগর সভাপতি কমরেড আবুল হোসাইন।

স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা ঘোষণার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দিনটি ঐতিহাসিক। কেননা, এদিন ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্র ইউনিয়ন-‘ইপসু’ (মেনন) কর্তৃক অায়োজিত বিশাল জনসভায় ১১ দফা কর্মসূচি সংবলিত প্রচারপত্রে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ ঘোষণা দেওয়া হয়। ছাত্র সমাজের সেই ঘোষণা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।
৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধই স্বাধীনতার ইতিহাস। কিন্তু এর প্রকৃত ইতিহাস অারও বিস্তৃত। মূলত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। আর দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের নেপথ্যের মূল রূপকার মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনিই সর্বপ্রথম ‘আস্‌সালামু আলাইকুম’ বলে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেন, স্বাধীনতার কথা বলেন।
দিনটিকে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা ঘোষণা দিবস’ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি।
সহনশীল তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়েই দেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস রচনা করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে প্রকৃত বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিল এটা যেমন সত্য, তেমনি মাওলানা ভাসানী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পিতা—এটাও ইতিহাসের সত্য। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠও সত্য। আর ভাসানী-মুজিবের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো। ইতিহাসের যার যার প্রাপ্য সম্মান, তাঁকে দিতে হবে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালিরা নয়, পাকিস্তানিরাই দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলেও জহির রায়হান অন্তর্ধানের কারণ কি? তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কারণ কি? তা জানতে হবে। জহির রায়হান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কলকাতা থেকেই দেশবিরোধী, ষড়যন্ত্রকারী, লুটপাটকারী, সুবিধাবাদী আর আরাম-আয়েশকারীদের নিয়ে ফিল্ম তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ সমন্বয়হীনতার মধ্য দিয়ে চলছে বলেই দেশে এত বিভক্তি-বিরোধ। যার জন্য ৪৮ বছরেও স্বাধীনতার স্বপ্ন জনগণের সামগ্রিক মুক্তির অাকাঙ্ক্ষা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়নি।
আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ থেকে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ডাক দেওয়া হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার। সেই সভায় বক্তৃতা করেন ১৯৬২ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসন ও শরিফ শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদনবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও তৎকালীন শ্রমিক নেতা প্রয়াত কাজী জাফর আহমেদ (সাবেক প্রধানমন্ত্রী), ডাকসুর সাবেক ভিপি ও তৎকালীন উদীয়মান কৃষক নেতা রাশেদ খান মেনন (বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি) এবং ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাহবুবউল্লা।
ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ২২ ফেব্রুয়ারির জনসভার শুরুতে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার (কর্মসূচি) প্রস্তাবনা পাঠ করেছিলেন আতিকুর রহমান।
২২ ফেব্রুয়ারি পল্টনের জনসভা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। আর তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন ছিল ছাত্র আন্দোলনের ‘নেইম অ্যান্ড ফেইম’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ‘ভ্যানগার্ড’-এর ভূমিকা পালন করে। ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ছাত্র ইউনিয়ন-‘ইপসু’ই প্রথম জনসভা করে প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক দেয়।
১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল সুর ও আকাঙ্ক্ষা ছিল সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, সব বৈষম্যের অবসান ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। সত্তরের ২২ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের অনন্য দিন, ইতিহাসের বাতিঘর। দেশের চলমান রাজনীতির মত পার্থক্য ও কলুষ রাজনীতি দিয়ে সত্তরের ২২ ফেব্রুয়ারিকে বিচার করলে চলবে না। ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের ‘মাইল ফলক’। তাই স্বাধীনতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২২ ফেব্রুয়ারি চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *