মহামারী করোনার প্রভাব বলয়ে আগামী অর্থ বছরের বাজেট: চিন্তিত অর্থমন্ত্রী ও দেশবাসী

Spread the love

শেখ জুয়েল রানা” স্টাফ রিপোর্টার’

ঢাকা, ০২ এপ্রিল ২০২০: মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে দেশে দেশে লক ডাউন ও গৃহীত ব্যবস্থায় প্রশমনজনিত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার সম্মুখীন অামাদের অাগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। এই বাজেট তৈরিতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের হাতে সময় আছে আর মাত্র দুই মাস। চিন্তিত অর্থমন্ত্রী। প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়ে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ। আগামী বাজেটেও কি তাই বাড়বে? এখন যে চলছে বৈশ্বিক মহামারি-যার প্রভাবে বাংলাদেশসহ সবার অর্থনীতিই চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লক ডাউন ও গৃহীত ব্যবস্থায় প্রশমনজনিত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় তাহলে অামাদের করণীয় কি? তা জানতেই অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও তার সচিবদের নিয়ে মঙ্গলবার বৈঠকে বসেছিলেন।
রাজধানীর গুলশানে অর্থমন্ত্রীর নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত ‘করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও উত্তরণ’ শীর্ষক পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আসাদুল ইসলাম, অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন।
বৈঠকের পর অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অথর্মন্ত্রী সবার উদ্দেশে বলেছেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি শংকিত। চলছে বৈশ্বিক মহামারি করোনা। এদিকে আসছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। করোনার প্রভাবে আগামী বাজেটে যাতে আর্থিক সংকট না হয়, সেজন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা চাওয়া হবে বলে সচিবদের আশ্বস্ত করেছেন তিনি। এ জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও তাদের জানান।
করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়তে পারে-তার একটি ফিরিস্তিও সচিবদের সামনে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাব কতদিন প্রলম্বিত হয় আমরা জানি না। এরই মধ্যে আমাদের আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম হয়েছে।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ আরও কম হতে পারে। ফলে অন্যান্য দেশের মত নানামুখী অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবিলা করতে হতে পারে বাংলাদেশকেও।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে দীর্ঘ ছুটি বা কার্যত লক-ডাউনের (অবরুদ্ধ অবস্থা) ফলে রপ্তানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটিরশিল্পসহ উৎপাদনমুখী সব প্রতিষ্ঠানেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পরিবহন সেবা ব্যাহত। স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমবে এবং সরবরাহ ববস্থায় সমস্যা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা দেরি হওয়ার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হোটেল-রেস্তোরা, পরিবহন এবং আকাশপথে যোগাযোগের খাতও বিপদে পড়েছে। এ খাতগুলোর ওপর ইতিমধ্যেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারেও। এদিকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের চাহিদা কমেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রবাসী আয়ের (রেমিটেন্স) ওপরও।
তবে অর্থমন্ত্রী প্রবাসী আয় নিয়ে অতটা হতাশ নন বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। যুক্তি হিসেবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যেহেতু গত আট মাসে প্রবাস আয়ে ২১ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি ছিল, সেহেতু আগামী চারমাসে তা কিছুটা কম হলেও অর্থবছর শেষে আগের অর্থ বছরের তুলনায় কম হবে না বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এবং ইতিমধ্যেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগোলেও প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস জনস্বাস্থ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর নেতিবাচক থাবা বসাতে যাচ্ছে। সবাই জানেন, বাংলাদেশও এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়-এসব কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী।

এখন পর্যন্ত কী করা হয়েছে? জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় আহারের ব্যবস্থা করা। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কী করা হয়েছে, তার একটি চিত্রও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। বলেন, দেরি না করেই স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এরই মধ্যে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি ও মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা খাত থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়-বান্ধব কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন-আগামী জুন মাস পর্যন্ত কোন গ্রাহক যদি কিস্তি পরিশোধে অপরাগও হন, তারপরও তাকে ঋণ খেলাপি না করার ঘোষণা দিয়েছে। এনজিওগুলোর গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে অপরাগ হলে ঋণ খেলাপি করা হবেনা।
রপ্তানি আয় আদায়ের সময়সীমা ২ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ৪ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। মোবাইলে ব্যাংকিংয়ে আর্থিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো হয়েছে।
শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের আঘাত মোকাবিলায় কিছু আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য এরই মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

আরও কী করা হবে? জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, রপ্তানীমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটিরশিল্পবিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হাতে নেওয়া হবে। অব্যাহত থাকবে বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি। ‘ঘরে-ফেরা’কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের ব্যক্তিদের নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে সহায়তা দেওয়া হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য দেওয়া হবে বিনামূল্যে ঘর ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ।

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‌‘করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় আমরা প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবা। এখন দরকার সবারই ঘরে থাকা। এ যুদ্ধ আমরা মোকাবিলা করবই।’

আগামী বাজেট নিয়ে জানতে চাইলে মুস্তফা কামাল বলেন, ‌‘বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ (আইডিবি) সব উন্নয়ন সহযোগীর কাছেই আমরা অর্থ সহায়তা চাইব।’

‘করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও উত্তরণ’ শীর্ষক অাগেভাগে সময়মতো পর্যালোচনা বৈঠক করার জন্য অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “সম্প্রতি ব্রিটিশ বিজনেস গ্রুপের এক প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শিল্প খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান অনেকটা অকপটেই বললেন, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আলোকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর জন্য আসন্ন বাজেট প্রণয়ন একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
অামাদের দেশে সম্প্রতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠা করোনার আঘাত সবশেষে কোথায় পৌঁছবে এখনো তা অজানা, তবে ধারণা করা অসম্ভব কিছু না। যেমন, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে অর্থনীতির দুটি প্রধান খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হবে করোনায়। এ ক্ষতি হবে রফতানি ও উৎপাদন হ্রাসে আর সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ লেনদেন ও চাহিদা কমে যাওয়ায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তাদের প্রাথমিক পর্যালোচনায় অবশ্য বলেছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে এ ক্ষতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। করোনার আপদ বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এমন একসময় এসে হাজির হয়েছে, যখন ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের হিসাবের আলোচনার মধ্যেও অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মন্দা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
জাতীয় বাজেটের দুটি প্রধান দিক হলো আয় ও ব্যয়। আয় না করে ব্যয় হলে ধারদেনায় জড়াতে হয় সরকারকে। এজন্য সরকারের আয় বা রাজস্ব আহরণ বাজেট বা অর্থনীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮-১৯ বছরটিতে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, স্থির হিসাবে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্থনৈতিক বিকাশ হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো বিকাশমান অর্থনীতির জন্য প্রবৃদ্ধির এ হার নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। তবে এ সময়ের চূড়ান্ত হিসেবে বাজেটের ৩ লাখ ৫ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকে সর্বোচ্চ। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সরকারের রাজস্ব আয়ের যে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল, তা প্রায় অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অর্থবছরও সরকারের আয় বিপর্যয়ের কারণে মোট রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা তথা জিডিপির ৯ শতাংশের বেশ কিছুটা নিচে থাকবে বলে অনেকেই বলেছেন। অথচ এ অনুপাতকে অর্থমন্ত্রী তার চলতি বাজেট বক্তৃতায় ১৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
চলতি অর্থবছরের আট মাসে সার্বিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে মোট ৬৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২০ শতাংশ। এ হারে যদি রাজস্ব আদায় হয়, তাহলে বছর শেষে জিডিপির ১৩ শতাংশের সমান রাজস্ব আদায় স্বপ্নই থেকে যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর রাজস্ব আদায় সাত মাসে সাড়ে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা আক্রান্ত শেষ চার মাসে রাজস্ব আহরণের বাস্তব অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে, তা আমদানির চিত্র সামনে রাখলে কিছুটা স্পষ্ট হবে। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুসারে আমদানি আগের বছরের তুলনায় পৌনে ৩ শতাংশ কমে গেছে। আর এ সময়ে নতুন ঋণপত্র স্থাপনের তথ্য এবং করোনার আঘাতে বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থার ক্ষতি বিবেচনায় নিলে এটা প্রায় নিশ্চিত, বছর শেষে আমদানি ৯-১০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
আমদানি খাত থেকেই সরকারের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে। তবে এ সময়ের রফতানি চিত্র আরো নেতিবাচক হওয়ায় সার্বিক উৎপাদন খাতের দুরবস্থারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ অবস্থায় বছর শেষে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
সাধারণভাবে সরকারের আয় কমে গেলে ব্যয়ের রাশ টেনে ধরার কোনো বিকল্প নেই। সেটি না করা হলে সরকারকে নিজস্ব প্রশাসন, রাজস্ব ব্যয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ধারদেনা করতে হয়। সরকারের ধারদেনা নেয়ার দুটি সূত্র হলো ব্যাংক খাত, আর সঞ্চয়পত্র বিক্রয়। দেশের মানুষ সঞ্চয়পত্র না কিনলে অর্থের জোগাড় হয় না। আর মানুষের হাতে টাকা না থাকায় এবং কর বৃদ্ধি ও ক্রয়সীমা বেঁধে দেয়াসহ অন্যান্য কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ৭৮ শতাংশ কমে গেছে। বাকি ভরসা হলো ব্যাংক খাত। ব্যাংক খাত থেকে ধার নিতে সরকারের কার্যত কোনো বাধা নেই, তবে এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বেশির ভাগ সময় সংকুচিত হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে আর্থিক ভারসাম্যও কিছুটা ব্যাহত হয়। সরকারের আয়ের দুর্গতির পরও চলতি খরচ বজায় রাখতে গিয়ে ব্যাংক খাত থেকে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সাড়ে ৩৮ শতাংশ বাড়তি ঋণ নিতে হয়েছে। এ সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে মাত্র সোয়া ৪ শতাংশ। ব্যাংক খাত থেকে ধার নিয়েও ব্যয় নির্বাহ সম্ভব না হওয়ায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি তহবিল সংসদে আইন পাস করে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এক্ষেত্রে সরকার ভারতকে অনুসরণ করেছে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে বিদেশী সূত্র থেকে ঋণপ্রাপ্তিও দুরূহ হতে পারে। অর্থবছরের প্রথমার্ধে বিদেশী সূত্র থেকে নিট অর্থপ্রাপ্তি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে, অথচ আগের বছর তা ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অর্থবছরের বাকি সময় বিদেশী অর্থপ্রাপ্তি আরো কমে যেতে পারে, বিশেষ করে চীনা সূত্র থেকে।
এ বাস্তবতায় বাজেট বাস্তবায়নের বাস্তব যে চিত্র দাঁড়াচ্ছে তা হলো, সরকারের আয়ে রেকর্ড পরিমাণে ঘাটতি। এ ঘাটতির জন্য সরকার ঋণ নিয়ে রাজস্ব ব্যয় ও জরুরি উন্নয়ন খরচ সামাল দিতে অনেকটা বাধ্য হবে বলেই সংশ্লিষ্টজনের ধারণা। এতে বাজেট ঘাটতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেড়ে যেতে পারে। এক পর্যায়ে দেশী ও বিদেশী কোনো সূত্র থেকে যখন আর ঘাটতি অর্থায়ন করা যাবে না, তখন বাজেটের বরাদ্দগুলো ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করতে হবে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়গুলোকে সংশোধিত বাজেটে ২০ শতাংশ করে গড় কাটছাঁট করে বাজেট প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। করোনার কারণে আশু কোনো ‘বিশেষ প্যাকেজ’ বা বিশেষ বিশেষ খাতে অনুদান দিতে হলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হবে।
এ কাটছাঁটের অর্থ দাঁড়াবে নতুন অর্থবছরের বাজেট ভিত্তি নিচে নেমে যাওয়া। এক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই ২০২০-২১ সালের বাজেটে গতানুগতিকভাবে চলতি মূল্যে আগের বছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। জিডিপির অনুপাতে বাজেটের সবক’টি লক্ষ্যমাত্রা অনিবার্যভাবে কমবে। তবে চলতি অর্থবছরের মতো বাস্তবায়নের কথা মাথায় না রেখে বাজেট তৈরি করা হলে যেকোনো সংখ্যায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাও সম্ভব। এক্ষেত্রে আকবর আলি খানের ভাষায়, ‘বাস্তবায়ন না করতে হলে যেকোনো আকারের বাজেটই ভালো বাজেট’।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, যেখানে ৭-৮ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেখানে বাজেট বাস্তবায়নের এ দুরবস্থা কেন দেখা যাচ্ছে? রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছে কেন যাওয়া যাচ্ছে না? অন্যদিকে রাজস্ব ব্যয় অব্যাহতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন অর্থনীতির এক সূচকের সঙ্গে আরেক সূচকের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে, অর্থনীতি ৭-৮ শতাংশ হারে বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখন প্রায় মৃত। ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় বাজারের শেয়ারসূচক এখন প্রায় তলানিতে। ব্যাংকগুলোতে শ্রেণীভুক্ত ঋণের অংক ক্রমেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ বাস্তব কর্মবাজারে নেই। অর্থনীতির হালচাল প্রকাশে রাজনীতির মতোই এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণ’ কাজ করছে। বাস্তবে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গেছে। একদিকে আমদানি কমে যাচ্ছে আর অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদনেও শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থার আশঙ্কা রফতানি খাতে। করোনার প্রভাবের আগেই অর্থবছরের সাত মাসে রফতানি আয় পৌনে ৩ শতাংশ কমে গেছে। শেষ চার মাসে বড় ধরনের আয় পতনের আশঙ্কা বিশেষ করে পোশাক রফতানিকারকদের।
পাঠ্যবইতেই আছে, আমদানি খাত ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতে দুরবস্থা দেখা দিলে রাজস্ব আদায় কোনোভাবে বাড়ানো যায় না। করপোরেট আয়কর প্রধানত ব্যাংকের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো অনিয়মিত ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে মুনাফার বাড়তি অংক কষছে। এতে প্রদর্শিত মুনাফার ৪৫ শতাংশ সরকারের কোষাগারে আয়কর হিসেবে জমা হচ্ছে। কিন্তু যে অর্থ কোনো দিন ব্যাংকের কাছে ফিরে আসবে না, সেটি মুনাফা দেখিয়ে বণ্টন করার এ কাজে ব্যাংকের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদকে জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা পরিচালকরা পরস্পরের সঙ্গে অনেকটা বোঝাপড়া করে নিয়ে গেছেন। এ হিসাব বেনামে তারা যে অর্থ নিয়েছেন, তার বাইরে। ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকদের হিসাব অনুসারে, এ অর্থের পরিমাণ অনেক অনেক বেশি।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটিসহ দেশী-বিদেশী নানা পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ও অর্থনীতি থেকে বিপুল অংকের টাকা বের হয়ে যাওয়ার চিত্র আসছে। ১১ লাখ কোটি টাকার ব্যাংকঋণের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবমতে, প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা খেলাপি। কিন্তু ব্যাংক উদ্যোক্তারা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নামে-বেনামে যে টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নিয়ে গেছেন, সেই অর্থ এর সঙ্গে যুক্ত হলে দেখা যাবে ব্যাংক খাতের অর্ধেক ঋণই অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। এতে সার্বিকভাবে আর্থিক খাত ভেঙে পড়তে পারে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারের শেষ ভাগে বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে এখনো। অর্থনীতির উন্নয়ন অগ্রযাত্রা হয়তো আরো দুই বছর থাকবে। কিন্তু এরপর কী হবে, সেটা বলা মুশকিল।’ সাবেক অর্থমন্ত্রী যখন এ সাক্ষাৎকার দেন, তখনো করোনা আঘাত করেনি। তার দুই বছর সময় সম্ভবত এখন সংকুচিত হয়ে আসছে। অর্থনীতির মূল ভিত্তি আর্থিক খাত। এ খাতের অবস্থা নীতিনির্ধারকদের অজানা নয় বলে তারা ব্যাংক অবসায়ন ও একীভূতকরণের আইন ও বিধিবিধান তৈরি করছেন। এ ব্যাপারে ত্বরিত পদক্ষেপ না নিলে শুধু আর্থিক খাতই নয়, অর্থনীতির মূল ভিত্তিই ধসে যেতে পারে। বাজেট তৈরির এ সময়ে অর্থনীতির মুদ্রা ও রাজস্ব খাতের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তথ্য-উপাত্ত সামনে রাখা হলে এ সত্য এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না। কেউ কেউ আবার প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচারকারী ও বৃহৎ ঋণখেলাপিদের জন্য একটি ‘এক্সিট রুটের’ কথাও বলছেন।
সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল দেশপ্রেমের কথা বলে অর্থনীতির বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির চাকাকে সচল রেখে, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনকে সামাল দেয়ার জন্য সামনে আসছে কঠিন সময়। একাত্তরের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক অাধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে অামাদের।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *