মজুরী বৃদ্ধির বিষয়ে মালিকপক্ষ চা শ্রমিকদের সাথে তামাশা করছে : রামভজন কৈরি

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা’

শ্রীমঙ্গল, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০: “চা শিল্পের মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সাথে সারাদেশের চা শ্রমিকদের একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষি সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের এ পর্যন্ত ৯ রাউন্ড টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার্টার অব ডিমান্ড দেয়ার পর এসব বৈঠকে সুযোগ সুবিধাসহ মজুরী বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রগতি নিয়ে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। মালিকপক্ষের সংগঠন সময় ক্ষেপণ করার একটা কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। অামরা চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ৩০০ টাকা দাবি করেছি, সেখানে অালোচনার টেবিলে ১ম রাউন্ডে ৩ টাকা, ২য় রাউন্ডে ২ টাকা, ৩য় রাউন্ডে ১ টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ৬ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। এতে স্পষ্ট, মজুরী বৃদ্ধির বিষয়ে মালিকপক্ষ চা শ্রমিকদের সাথে তামাশা করছে।” ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বুধবার লেবার হাউসে অামাদের প্রতিনিধির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি এসব কথা বলেন।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে এবং দৈনিক নগদ মজুরি ন্যূনতম ৩০০ টাকা নির্ধারণের দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে অামাদের প্রতিনিধিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “ব্রিটিশ আমল থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ শিল্পের অবদান কম নয়। বিশ্বে ২৫টি দেশে বাংলাদেশের চা রপ্তানি হচ্ছে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বড় একটি অংশ চা শ্রমিক। ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৩ সালে চট্টগ্রামে চা শিল্পের গোড়াপত্তন হয় এবং পরিপূর্ণ রূপ পায় ১৮৫৭ সালে সিলেটে। দীর্ঘ সময়ে চা শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখা সত্ত্বেও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী প্রদান নিশ্চিত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকার সমভাবে প্রাপ্য হলেও চা শ্রমিকরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার বলে প্রতীয়মান। তারা সমাজের এক অবহেলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। তাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার কারণে তারা কোনোমতে জীবন যাপন করছে। তাই তাদের জীবনমান উন্নয়নে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করাও দরকার। মোটাদাগে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে হবে।
একজন চা শ্রমিকের মজুরী খুবই সামান্য, যা টাকার অঙ্কে দৈনিক ১০০ টাকার সামান্য বেশি। বাংলাদেশের কোনো শ্রমিকের বেতন এত কম হতে পারে, তা জানা নেই। চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের যৌথভাবে কয়েক রাউন্ড টেবিলে অালোচনা দরকষাকষির দুই বছর অন্তর মজুরীসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। মজুরীর বাইরে মালিকপক্ষ কর্তৃক এক কক্ষবিশিষ্ট আবাসনের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে গাদাগাদি করে তাদের বসবাস করতে হয়। সরকারের সমাজসেবা বিভাগ কর্তৃক সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বছরে একবার পাঁচ হাজার টাকা সমমূল্যের খাদ্যশস্য দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সব শ্রমিক এর আওতায় পড়ে না। বিশেষ করে দুস্থ নারী শ্রমিকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় সাহায্য প্রদান করা হয়। তাদের চিকিৎসার জন্য নামমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র আছে; কিন্তু তা নামকাওয়াস্তে। কেননা সেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। বাইরে এসে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের অনেকেরই নেই। দ্বিতীয়ত, তাদের নিজস্বতা ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে পারস্পরিক ওঠা-বসা ও আন্তসম্পর্ক অনেকটা কম। তাদের পানি ও পয়োনিষ্কাশনের সমস্যা প্রকট। নালা ও ছড়ার পানি তাদের একমাত্র অবলম্বন। বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন নিয়ে কাজ করা কিছু কিছু এনজিও তাদের সহায়তা করছে; কিন্তু কখনো কখনো মালিকপক্ষের বিরোধিতায় তারা তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করতে পারে না। শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সমাজের মূল স্রোতধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখাপড়া করতে গিয়ে কোনো না কোনো বৈষম্য কিংবা অবহেলার শিকার হচ্ছে তাদের ছেলে-মেয়েরা।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নানামুখী আয়োজন রয়েছে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমাদের অগ্রাধিকার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে আমাদের টার্গেট হওয়া উচিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। এ লক্ষ্যে কাজ না করলে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ চা শ্রমিক। আবার তাদের বড় এক অংশ নারী, যারা প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চা পাতা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের। কেননা দাঁড়িয়ে চা পাতা তুলতে হয়। সুতরাং তাদের গোটা জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা সফলভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এখনো অনেক কিছু বাকি, যার জন্য টেকসই উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর কার্যক্রম পরিকল্পনা গ্রহণে অগ্রাধিকার দিতে হবে প্রান্তিক, অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে। চা শ্রমিক এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।
আমাদের প্রথম কাজ হবে চা শ্রমিকদের জন্য একটি সম্মানজনক মজুরী কাঠামো নির্ধারণ করা। এ জন্য মালিকপক্ষকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। আবার চা শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের মজুরি বৃৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। বিদ্যমান চা শ্রমিক কল্যাণ আইনে শ্রমিকদের কল্যাণে অনেক বিষয়ের কথা বলা আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য চা শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ জোরালো অান্দোলন গড়ে তুলতে হবে। চা শ্রমিকদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য মানববন্ধন, সভা সমাবেশ, সেমিনার ও মতবিনিময় সভার অায়োজন করতে হবে। আর সরকারের পক্ষ থেকে গোটা বিষয়কে মনিটর ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টি আরো জোরদার করা দরকার। শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নও দরকার। স্বাস্থ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা এনজিওদের বাগানে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করা উচিত। শ্রমিকদের কল্যাণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেন কাজ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা তৈরি এবং সচেতন হওয়া জরুরি। তাদের কল্যাণে গৃহীত আইন-কানুন সম্পর্কেও ভালো ধারণা থাকা চাই। শ্রমিক নেতারা যাতে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করেন, সে জন্য সরকার ও সিভিল সোসাইটির লোকজন তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে হলে অন্যতম কাজ শোষণ বৈষম্য ও দারিদ্র্য হ্রাস করা, জীবনমান উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের অবশ্যই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে চা শ্রমিকদের উন্নয়নের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদ্যমান পক্ষগুলোকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। একটি ছোট পদক্ষেপের কথা বলে শেষ করছি। গত বছর থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চা শ্রমিকদের ছেলে-মেয়ের জন্য ভর্তি কোটা চালু করা হয়। ফলে সিলেটের চা শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার এক সুযোগ তৈরি হলো। উদ্যোগটি ছোট কিন্তু এর প্রভাব নিশ্চয় একদিন বড় হয়ে দেখা দেবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *