ভোটে অনাগ্রহ রাজনৈতিক দলগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে : মেনন

Spread the love

স্টাফ রিপোর্ট”
জাতীয় সংসদ ভবন, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খুব কম ভোটার ভোট দিতে এসেছেন। ভোট থেকে মানুষের দূরত্ব গণতন্ত্রের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। মানুষের এমন অনাগ্রহ নির্বাচন তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে।
সোমবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে মেনন এসব কথা বলেন। তিনি অর্থ ও শিক্ষা খাত নিয়েও সমালোচনা করেন।
একাদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি প্রথমেই মাননীয় স্পীকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্যের শুরুতে ভাষা শহীদদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এবং শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে স্বাধিকার স্বাধীনতার চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তাকে দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাঙালি জাতি পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি এতটুকু দ্বিধায় ভোগেন নাই। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে যে ধর্মীয় আবরণ দিয়ে তাকে পাকিস্তানি আদলে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তার ছেদ ঘটানো হয়েছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার অবসান হয় নাই। রাষ্ট্রীয় প্রচারে, আমাদের আচার আচরণে, বেশ-ভূষার পরিবর্তনে তার রেশ আমরা দেখি। ফেসবুক, ইউটিউবের নিত্য প্রচারে সেই মনমানসিকতাকে উসকে দেয়া হচ্ছে প্রতিদিন। ভাষা আন্দোলন যেমন আমাদের জাতিসত্বাকে নির্দিষ্ট করেছে, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুও নির্দিষ্ট করে বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব আমি বাঙালি, বাঙলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা’ তিনি আরও বলেছিলেন আমি বাঙালি, যা কিছু বাঙালির তাই আমাকে আলোড়িত করে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার ব্যাপারে তার কোন দ্বিধা ছিল না। কেবল বাঙালি নয়, বিশ্বমানবের কথাও তিনি বলেছিলেন। বাংলাদেশকে দেখেছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। তাকে তার জন্মশতবর্ষে হাজারো সালাম।”
কমরেড রাশেদ খান মেনন বলেন, রাষ্ট্রপতি সংসদীয় পদ্ধতির রীতি অনুসারে কেবিনেট অনুমোদিত বক্তব্য বলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সাফল্য, কর্মোদ্যগসমূহ বিস্তৃতভাবে তার বক্তৃতায় বলেছেন। তবে সম্প্রতি সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেকথাগুলো তিনি বলছেন তা কেবল গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণই নয়, সরকারের এই কর্মোদ্যগকে এগিয়ে নিতে দিক নির্দেশকও বটে।
মেনন বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যের কথা বলেছেন। একথা সত্য যে এই সরকার সাক্ষরতার হার গত এক দশকে ২৮.৯ শতাংশ থেকে ৭৩.৯ শতাংশে নিয়ে গেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুর ভর্তির হার ৯৭.৮৫ ভাগে উন্নীত হয়েছে। ঝরে পড়ার হার ১৮.৬ শতাংশে নেমে এসেছে প্রাথমিক শিক্ষা চক্র সমাপণের হার ২০০৮-এর ৫০.৭ শতাংশ থেকে এখন ৮১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু শিশুরা হারিয়েছে শৈশবের আনন্দ। পিএসসি নামক পাবলিক পরীক্ষার ভয় তাদের প্রথম থেকেই কোচিং নির্ভর করেছে। এটা ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ছিল না। এখন এটা তুলে দেয়ার কথা উঠলেও, উঠছে না। ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে প্রাথমিক শিক্ষায় পাশের হার ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি হলেও শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি, অংক কোনটাই ভালভাবে জানে না। শিক্ষার গোড়ায় এই গলদ মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এমনকি উচ্চ শিক্ষায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে।
মাধ্যমিক ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন করা হচ্ছে বলে প্রকাশ। এনিয়ে কোথায় আলোচনা হয়েছে বলে জানা নাই। বিএনপি-জামাত আমলে একমুখী শিক্ষার নামে মাধ্যমিক সাধারণ শিক্ষার অবনমনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। বিজ্ঞান, গণিতকে পিছে ঠেলে শিক্ষা ধর্মীয় ও ব্যবসায়ী ভিত্তিক করার চেষ্টা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শাসনামলে সে ধরনের পশ্চাদগামীতা হবে না আশা করি। তারপরও এই নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিছু করার আগে প্রয়োজন সংসদে আলোচনা। পাঠ্য বইয়ে হিন্দু লেখকদের লেখা তুলে দেয়া, গল্প-কথা-চিত্রে ধর্মভাবের প্রতিফলনের নতুন সব ব্যবস্থা আমাদের আতকিংত করে। সেই ছোট বেলায় আমাদের মধ্যে পাকিস্তানি ভাব আনতে, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’, কে ‘সুবেহ সাদেকে উঠে দিলে দিলে বলি, হররোজ আমি যেন ভাল হয়ে চলি’ বলে পড়ানো হত। সেই ভাবটাই নিয়ে আসা হচ্ছে পাঠ্যবইগুলোতে। বাঙলা, বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য আর পাঠের বিষয়বস্তু না। তা’হলে ভাষার মাস বা মুজিব শতবর্ষ উদযাপন কেন?
কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সম্পর্কে যে কথা বলছেন তা আরও ভয়ংকর। সান্ধ্যকোর্সের নামে বাণিজ্য, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আপত্তি, ভিসিদের দুর্নীতি, গবেষণা না করা- এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ক্লাসে ‘ব্লক চেইন’ পাঠ্য করা হবে। কিন্তু আইসিটিতে আমরা প্রচুর অর্থ আয় করতে পারলেও, আইসিটি শিক্ষাকে ল্যাজে গোবর করে ফেলেছি। এখানেও গোড়ায় গলদ। আইসিটি শিক্ষার মান, পাঠ্যবই এসব কিছুকে পর্যালোচনা না করলে অর্থমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মী পাওয়ার আশা বৃথা হবে। সে বিষয়ে মাননীয় শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
কমরেড মেনন বলেন, প্রধানমন্ত্রী কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগড়ায় পৌঁছাবার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে দূরে থাক, উপজেলায়ও ডাক্তার থাকে না। মেডিক্যাল শিক্ষার বিস্তৃত ব্যবস্থা হলেও, সেখানকার দুর্নীতির সব দুভার্গ্যজনক খবর বেরুচ্ছে। চীন যেখানে করনোভাইরাসের মোকাবিলায় সাতদিনে হাসপাতাল বানিয়ে ফেলছে, সেখানে আমাদের বিমানবন্দর-স্থল বন্দরে রোগ সনাক্তকরণের ব্যবস্থা করতে পারে নাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যে মনোভাবের কারণে ডেঙ্গু নিয়ে মেয়র-স্বাস্থ্য মন্ত্রী উপেক্ষা-উপহাস করেছিলেন করনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে সেটা হলে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে সেটা বোঝা যায়।
কমরেড মেনন অারো বলেন, অর্থনীতি নিয়ে আমি আজকে বিশেষ কিছু বলব না। অর্থমন্ত্রী সংসদে অর্থনীতির ভাল অবস্থার কথা বললেও, বাইরে স্বীকার করেছেন যে রপ্তানিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নেতিবাচক। বিরোধী সদস্যরা তাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী না বলায় তিনি দুঃখ পেয়েছেন। তবে ‘বৃক্ষ তোর নাম কি, ফলে পরিচয়’। জুন মাসের বাজেট অধিবেশন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে বৈষম্য কি পরিমাণ বেড়ে যাবে তা দেখার বিষয়। আয় বৈষম্য এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাকিং খাতের দূরাবস্থার কথা না বললেই নয়। সরকার এ বছর ব্যাংক যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার কথা অর্থবছরের ছ’মাসেই তা প্রায় নেয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ ১১ বছরে সর্বনিম্ন। এই ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯.৮৩ শতাংশ। ঋণ খেলাপি বাড়বে না বলে অর্থমন্ত্রী যে দাবি করেছিলেন তা মিথ্যা প্রমাণ করে গত এক বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার উপর খেলাপি ঋণ বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন তা ব্যবসায়ী বান্ধব হলেও, ব্যাংক বান্ধব বা অর্থনীতি বান্ধব ছিল না। এই নিয়ে সে সময় ৬৮ বিধিতে নোটিশ দিলেও স্পীকার তা আলোচনায় দেননি। ফলে অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন তাকেই ‘আহা বেশ বেশ’ বলে আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। সংসদে কোন নোটিশ গ্রহণ করা হবে, কি আলোচনা করা যাবে তা নির্ধারণের এখতিয়ার স্পীকারের। এমনিতেই ’৭০ বিধির কারণে সংসদ সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্বাধীন মতামত দিতে পারেন না। তার উপর এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা না গেলে, সংসদে কেবল আমরা স্তুতি শুনব। সংসদ সম্পর্কে জনগণ যেমন, তেমনি সদস্যরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলব।
কমরেড মেনন বলেন, যে কথা বলছিলাম গতকালই রিপোর্ট বেরিয়েছে বাংলাদেশ ঋণখেলাপিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের শীর্ষে, ১১.৪ শতাংশই খেলাপি ঋণ। আর গত দশ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা যা দিয়ে অর্থমন্ত্রীর আগামী বছরের বাজেট হত। নিউইয়র্কেও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটির গবেষণা মতে ২০১৪ সালে এক বছরেই এই অর্থ পাচারের পরিমাণ ৯ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৭২ হাজার কোটির সমপরিমাণ অর্থ। এই অর্থ পাচারকারীরা কানাডা, মালয়েশিয়া, ব্যাংককে বেগমপাড়া বানিয়েছে। কানাডা প্রবাসীরা এদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। তালিকা প্রকাশ করতে বলেছে। আমিও বলি সংসদে ঋণ খেলাপিদের মত এই অর্থ পাচারকারী-বেগমপাড়ার মালিকদের নাম প্রকাশ করা হোক। ব্যাংক নিয়ে একটা সমাধানে আসতে ব্যাংক কমিশন গঠন করা হোক। একই পরিবারের ৯ জন ব্যাংক পরিচালক হওয়ার যে বিধান ব্যাংক মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে বিধান করে যে আইন হয়েছে তা রদ করা হোক। সর্বোপরি ব্যাংক লুটেরাদের অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।
মেনন বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ইউনিভার্সাল পেনশন স্কীমের কথা বলেছিলেন, যা মহামান্যের বক্তৃতায় উল্লেখ নাই। এটা গ্রামীণ শ্রমজীবী, খেতমজুর ও শ্রমিক দিয়ে শুরু করতে হবে এবং সেটা কন্ট্রিবিউটরি হবে না। কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্র এই দায় বহন করবে।
কমরেড মেনন অারো বলেন, কৃষি পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিস্তারিত বলেছেন। সামনে বোরো মৌসুম। বেরো ধান ক্রয় ও মূল্য নিশ্চিত করতে এখনই আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা উৎপাদক সমবায়ের মাধ্যমে করার জন্য বলছি। এজন্য এ ধরনের সমবায় উৎসাহিত করতে হবে। সমবায় আইনকে আমলাতন্ত্র মুক্ত করতে সমবায় আইন সংশোধন করতে হবে।
কমরেড রাশেদ খান মেনন বলেন, পাট আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই পাট খাতকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ধ্বংস করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পাটখাত, বিশেষ করে পাটশিল্প পুনরুদ্ধারে পাট কমিশন করেছিলেন। তার সুপারিশ বাস্তবায়ন করুন।
গার্মেন্টস শিল্প আশি ভাগ রপ্তানি আয়ের উৎস হলেও এক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে পড়ছি। বাণিজ্য মন্ত্রী বলেছেন ৩২ হাজারের উপর শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী। অটোমেশনের প্রভাবে চাকরি ছাটাই হচ্ছে। এখানে সাযুজ্য বিধানে ব্যবস্থা নিতে হবে। নারী শ্রমিকদের কাজের স্থানে নিরাপত্তা, ৬ মাসের মাতৃত্ব ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহ নির্মাণ শ্রমিকদের আইন করতে হবে।
মেনন বলেন, সারা বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। ট্রাম্প-বরিস জনসন সাহেবরা পৃথিবীকে পারমানবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার পাশাপাশি জলবায়ু নিয়ে পৃথিবীকে চরম ঝুকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ সেখানে যে উদ্যোগ নিয়েছে তার জন্য প্রধানমন্ত্রী ধরিত্রী কন্যা তথা ‘চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ’ উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু যখন দেখি সুন্দরবনের পাশে রামপালের কয়লা বিদ্যুৎ কারখানা, এলপিজি কারখানাসহ বিপদজনক সব কারখানার ভীড় তখন সুন্দরবন থাকবে কিনা এ নিয়ে উদ্বেগ হয়। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিণামে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ‘কার্বন বোমা’র খপ্পরে পড়বে। ঢাকার বাইরের বায়ু তো বটেই, ঘরের বায়ুও দূষিত। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগের পানি পুতিগন্ধময়। তখন কেবল পরিবেশবাদীরাই নয়, সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়। কিছু মুনাফালোভীর দল পরিবেশ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সব উদ্যোগকে এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। সুন্দরবন ধ্বংসের দায় তার উপর পড়ছে। আমরা যেখানে নেপালের সাথে সহযোগিতায় জলবিদ্যুৎ পেতে পারি, পেতে পারি ভুটানের বিদ্যুৎওÑ আঞ্চলিক সহযোগিতায় সেই পথ ছেড়ে কিছু ব্যক্তির মুনাফা লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করছি। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে। তবে নিজের পরিবেশ-প্রতিবেশ-ঐতিহ্য আর মূল্যবোধকে ধ্বংস করে আমরা সেপথে এগুবো কিনা সেটা আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে।
রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, আমি শুরুতেই বলেছি বঙ্গবন্ধু এদেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল নীতি উপহার দিয়েছিলেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি কেবল সোচ্চার ছিলেন না কেবল, বাস্তবে তার অনুসরণ করেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিলে আইন তার ব্যবস্থা নেবে। আমি এই সংসদে মাননীয় স্পীকারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে ইউটিউবে প্রচারিত ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি ও বিভাজনের কিছু বক্তব্যের পেন-ড্রাইভ দিয়েছিলাম। সে সবের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানা নাই। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর স্বপক্ষে ওয়াজকারী জনৈক আজাহারী সম্পর্কে ধর্মমন্ত্রী বলেছেন তিনি জামাতের পক্ষ হয়ে সে কাজ করেছেন। আইসিটি আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় নাই। বরং তাকে নির্বিঘ্নে মালয়েশিয়ায় চলে যেতে দেয়া হয়েছে। আর শরিয়ত বাউলকে আইসিটি আইনে গ্রেফতার করে জেলখানায় রাখা হয়েছে। মাননীয় স্পীকার এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের দেশে শরিয়ত ও মারফতের দ্বন্দ্ব অনেক পুরাতন। এখন সউদী-পাকিস্তানি ও জামাতীদের ওহাবিবাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করতে এ ধরনের দ্বন্দ্বের সম্পর্কে যখন রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবহার করা হয় তখন উদ্বেগের বিষয়। রাষ্ট্র কি অতীতের মতো আবার মৌলবাদকে পোষকতা দিচ্ছে? না’হলে আজাহারী দেশ ছেড়ে যেতে পারে না। খতমে নবুয়ত নতুন করে হুঙ্কার ছাড়তে পারে না। হেফাজত সমর্থন (?) প্রত্যাহারের হুমকি দিতে পারে না। এরাই ক’দিন পর পাকিস্তানি কায়দায় ব্লাসফেমী আইন প্রণয়ন করতে বলবে, যেমন এই সংসদেই যুদ্ধাপরাধী নিজামী সেই প্রস্তাব তুলেছিল।
কমরেড মেনন অারো বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি এসেছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মত ভোটের দিন তাদের কোথাও দেখা যায় নাই। নির্বাচনকে বানচাল করা, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পিছন দরজায় ক্ষমতায় যাওয়ার তারা কৌশল নিয়েছে। এটা সত্য যে ঐ নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে খুব কম এসেছে। কিন্তু সেটা কেবল এ কারণেই নয়। আওয়ামী লীগ তথা চৌদ্দ দলের সমর্থকরাও ভোট দিতে আসে নাই। ভোট থেকে মানুষের এই দূরত্ব গণতন্ত্রের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। নির্বাচন তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে।
মেনন বলেন, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই তারা মরিয়া আক্রমণ করবে। ধর্মবাদী তো বটেই, ঐ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ডান ও তথাকথিত বামও এক হচ্ছে।
মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্থ করতে পারি, এর পরও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন উন্নত বাংলাদেশ হবার লড়াই অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ চিরজীবি হোক। আপনাকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *