বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন : সৈয়দ আমিরুজ্জামান

Spread the love

শেখ জুয়েল রানা (প্রতিনিধি)

শ্রীমঙ্গল, ২৯ জানুয়ারি ২০২০: “দুই হাজার দশ সালের শিক্ষানীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের কথা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা ছিল। এই শিক্ষানীতিতে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথাও বলা ছিল। শিক্ষা আইন খসড়া পর্যায়েই রয়ে গেছে। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল, বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা সম্ভব। যা বিগত ২০১৮ সালের মধ্যে হওয়ার কথা।
কিন্তু তা হয়নি। বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন ও যুক্তিযুক্ত হবে।” অামাদের প্রতিনিধি’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে সৈয়দ অামিরুজ্জামান এসব কথা বলেন।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক এবং বহুমাত্রিক লেখক। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, অারপি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট। তিনি ‘৮২ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ স্বৈরাচার বিরোধী জেলা পর্যায়ে ছাত্র গণঅান্দোলনে নেতৃত্ব করেছেন। সৈয়দ অামিরুজ্জামান কেন্দ্রীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। কুমিল্লায় বিভিন্ন সময়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ ও গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের অন্যতম নেতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ‘৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য। কৃষক মুক্তি সমিতি ও খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস থেকে মডিউল-১, ২, ৩-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক। বিএনসিসি’র প্রাক্তন ক্যাডেট। কুমিল্লা বীরচন্দ্র গণ-পাঠাগার ও নগর মিলনায়তনের সদস্য।
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও কুমিল্লা জেলা শাখার সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অাইন ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও কুমিল্লা ল’ কলেজের জননন্দিত সাবেক ছাত্র নেতা সৈয়দ অামিরুজ্জামান সাংবাদিকতা-লেখালেখির পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন অভিমূখী অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এখনও সক্রিয়।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখছেন তিনি। ১৯৮০ সালে কৃষি কথা’য় কবিতা প্রকাশ, ১৯৮৬ সালে সাপ্তাহিক নতুন কথা’য় রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে সাংবাদিকতার শুরু। ১৯৯৭ সালে ১৪ জুন দিবাগত রাত পোনে ২টায় মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত কমলগঞ্জের মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে ব্লো-অাউটের পর থেকেই ক্ষতিপূরণের দাবীতে অব্যাহত অান্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে অাসছেন। এই অান্দোলনের কিংবদন্তি এই নেতা ‘মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ অাদায় জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক।বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শ্রীমঙ্গল শাখার সংগঠক।
সৈয়দ অামিরুজ্জামান ১৯৮৩ সালে এসএসসি, ১৯৮৫ সালে এইচএসসি, পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অান্ডারে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক, ৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে ডিপ্লোমা ও পরবর্তীতে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করেন।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান ছাত্র সমাজের রক্তস্নাত ১০ দফা, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামসহ দুই হাজার দশ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনমত সংগঠনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষার সার্বিক অবস্থা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ’ পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ জুয়েল রানা।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: শিক্ষার কী অগ্রগতি হয়েছে?
সৈয়দ আমিরুজ্জামান: অামাদের শিক্ষায় সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিত্তহীন থেকে উচ্চবিত্তের মানুষ—সবাই বলবেন, আমি আমার সন্তানকে অবশ্যই লেখাপড়া করাতে চাই। আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও কোনো কোনো রাজ্যে কৃষকেরা বলেন, সন্তানকে লেখাপড়া করিয়ে কী লাভ? অামাদের দেশে এ কথাটি এখন কেউ বলে না। আরেকটি অর্জন হলো নারীশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর একটা পরিবর্তন হয়েছে। অার ২০০৮ সালে দিন বদলের শ্লোগান নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের সরকার অাসার পর থেকে মেয়েদের শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে, যার ফল এখন আমরা ঘরে তুলছি।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: আপনি বলছেন, শিক্ষার প্রতি সর্বস্তরের মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু যে শিক্ষা রাষ্ট্র দিচ্ছে, সেই শিক্ষা সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে কি?

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: এটাই সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। একদিকে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণেরা চাকরি পাচ্ছেন না। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২২ লাখ তরুণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। কিন্তু সরকার তাঁদের সবাইকে কাজ দিতে পারে না। এখানেই হতাশা। আবার সরকারি যে শিক্ষাব্যবস্থা, তার প্রতি ভরসা রাখতে পারছেন না বলে অনেকে অন্য ধরনের শিক্ষার প্রতি ঝুঁকছেন। কোচিং–বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। শিক্ষা ক্রমাগত পণ্যে পরিণত হচ্ছে। রাষ্ট্র লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বড় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: দুই হাজার দশ সালে সরকার যে শিক্ষানীতি চালু করেছিল, তা বাস্তবায়নের সমস্যা কোথায়?

সৈয়দ অামিরুজ্জামান: স্বাধীনতার পর অনেক দিন আমরা পূর্ণাঙ্গ কোনো শিক্ষানীতি পাইনি। ১৯৭৪ সালে কুদরাত–ই–খুদা শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীকালের সব শিক্ষানীতি ছিল খণ্ডিত। কিন্তু দুই হাজার দশ সালের শিক্ষানীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের কথা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা ছিল। এই শিক্ষানীতিতে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথাও বলা ছিল। কিন্তু এর কোনোটাই কার্যকর হয়নি। শিক্ষা আইন খসড়া পর্যায়েই রয়ে গেছে। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল, বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা সম্ভব। যা বিগত দুই বছর আগেই তা হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন ও যুক্তিযুক্ত হবে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: কেন বাস্তবায়িত হলো না?

সৈয়দ অামিরুজ্জামান: হয়তো শিক্ষাকে এখনো খণ্ডিত আকারে দেখা হয়। নীতিনির্ধারণের জায়গা থেকে শিক্ষানীতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি হিসেবে দেখা হয় না। ফলে যা হয়েছে খণ্ডিত, বিক্ষিপ্ত। প্রাথমিক স্তরে সরকারের একধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সবকিছু চলছে খণ্ডিতভাবে। প্রকল্পের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: দুই হাজার দশ সালের শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব ছিল। গত আট বছরেও তা কেন হলো না?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: বড় একটা ফাঁক তো থেকেই গেল। আমাদের শিক্ষাটা এখন জ্ঞানকেন্দ্রিক না হয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগে চারটি পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। পঞ্চম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি, এসএসসি ও এইচএসসি। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত পাবলিক পরীক্ষা নেই। বরং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: কিন্তু আমাদের এখানে সেই পরীক্ষাটিও তো ঠিকমতো হয় না। খাতায় কিছু না লিখলেও তো পাস করিয়ে দেওয়া হয়।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: পাবলিক পরীক্ষার মূল যে লক্ষ্য দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই, সেটি আমাদের পরীক্ষায় হয় না। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে। এই যে পরীক্ষায় ব্যাপক হারে পাস করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তারপরও গবেষণায় দেখা যায় ইংরেজিতে মাত্র ২৫ শতাংশ ও গণিতে ৩৫ শতাংশ দক্ষতা অর্জন করে। তাহলে পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন কী। ইদানীং নীতিনির্ধারকেরাও প্রাথমিক স্তরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা তুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। আমি মনে করি, সেটি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত করা প্রয়োজন। তাহলে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে আমরা মুক্তি পাব। কোচিং–বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যও কমবে। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, চতুর্থ শ্রেণি থেকেই কোচিং–বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা গাইড বইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: গত ১০ বছরে শিক্ষার মানের আরও অবনতি হলো কেন?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: গত ১০ বছরেই যে শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে, তা বলব না। তবে শিক্ষার মান যে প্রশ্নের মুখে, সেটি স্বীকার করতে হবে। আমাদের শিক্ষা পরীক্ষাকেন্দ্রিক বলেই ৫৬ ঘণ্টা পরীক্ষা দেওয়ার পরও একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা প্রকৌশলে ঢোকার জন্য আবার পরীক্ষা দিতে হয়। এর অর্থ ওই পাবলিক পরীক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্টদের আস্থা নেই।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: শিক্ষার মান নিয়ে যখন কথা উঠেছে, তখন শিক্ষা যাঁরা দেবেন, অর্থাৎ শিক্ষকদের মানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার শিক্ষকদের মান উন্নয়নে কী করছে?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: শিক্ষকদের মান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। দাতা সংস্থাগুলোও নিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি শুধু মানের নয়। শিক্ষকেরা হলেন শিক্ষাব্যবস্থার চালিকাশক্তি। প্রশ্ন হলো, যুগের চাহিদা মেটাতে পারে, এমন শিক্ষা তাঁরা নিতে পেরেছেন কি না। আবার নিলেও সেটি পাঠকক্ষে প্রয়োগ করতে পারছেন কি না। আমাদের মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বেশির ভাগ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। সরকার বিনা মূল্যে বই দেয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেয়। কিন্তু সেখানে নিয়োগ–বাণিজ্য চলে। ফলে মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: প্রতি বছর বাজেট দেয়া হয়। শিক্ষা খাতের বরাদ্দে কি আপনি খুশি?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। জিডিপির দুই থেকে আড়াই শতাংশ। শিক্ষার বাজেটকে টাকার অঙ্কে দেখলে হবে না। একজন শিক্ষার্থীর পেছনে কত টাকা ব্যয় হয়, সেটা দেখতে হবে। আবার এই বরাদ্দেও তারতম্য আছে। ক্যাডেট কলেজের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যয়ের অনেক ফারাক। মনে হচ্ছে রাষ্ট্র শিক্ষার দায়িত্ব থেকে ক্রমাগত পিছু হটছে। এটি আমাদের সংবিধানের মূল নীতির পরিপন্থী।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: শিক্ষানীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঋদ্ধ ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। অথচ এই সরকারের আমলেই তো মহলবিশেষের দাবির মুখে পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা হলো। অনেক প্রগতিশীল লেখক-কবির রচনা বাদ দেওয়া হলো। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: আমি বলব, এটি ভোটের রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেই প্রতিক্রিয়াশীল মহল এর বিরুদ্ধে হইচই শুরু করে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ধর্মের কোনো বিরোধিতা নেই। সরকার সম্প্রতি কারিকুলাম সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, আশা করি, সেখানে মুক্তবুদ্ধির ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে কিছু থাকবে না। মুক্তবুদ্ধির মানুষদের এই দাবি আরও জোরালোভাবে তুলতে হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করার বিষয় পাঠ্যবইয়ে থাকতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: শিক্ষা সমাজকে এগিয়ে নেবে, না সমাজ শিক্ষাকে এগিয়ে নেবে?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: আমি কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই, মূর্খদের কারণে সমাজ নষ্ট হয় না। সমাজ নষ্ট হয় শিক্ষিতদের মূর্খ আচরণে। শিক্ষার নামে এখানে অনেক তথাকথিত শিক্ষিতজন যা করছেন, তা মেনে নেওয়া যায় না। তাঁরা সমাজকে পেছনে টানতে চাইছেন।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু চাহিদা মেটাতে পারছে কি?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: আমরা যে জনশক্তি তৈরি করছি, সেটি বর্তমান যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পসহ অনেক খাতেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত জনশক্তির বড় অংশ আনতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছি না। আবার আমাদের জনশক্তির একটি অংশ বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁরা অদক্ষ বলে মজুরিও কম। আমাদের যে জনশক্তি, তাঁদের সবার জন্য কর্মসংস্থান করতে পারছি না। এ নিয়ে সরকারের নিবিড় কোনো গবেষণাও আছে বলে মনে হয় না। আমরা কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছি। কৃষিতে বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ও শ্রমবাজার নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হচ্ছে না। একটি বিষয়ে আমরা অবাক হই যে বর্তমান সরকারে যাঁরা মন্ত্রী আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী। তাঁদের তো ভালো জানার কথা আমাদের কী ধরনের জনশক্তি প্রয়োজন। সক্ষম জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বৈষম্যও কমবে না।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: আমাদের শিক্ষা কি বৈষম্য বাড়াচ্ছে না?

সৈয়দ আমিরুজ্জামান: অবশ্যই বাড়াচ্ছে। যারা ভালো সুযোগ পাচ্ছে, তারা ভালো আয়–রোজগারও করতে পারছে। কিন্তু যারা সেই সুযোগ পাচ্ছে না, তারা পিছিয়েই থাকছে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বেড়েছে।

সৈয়দ অামিরুজ্জামান: মোটা দাগে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কথা সবাই জানেন। ভর্তি–বাণিজ্য, নিয়োগ–বাণিজ্য আছে। কোচিং–বাণিজ্য আছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ জন শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। এটি শুধু দুর্নীতি নয়, ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা কিংবা জিপিএ–৫ সংস্কৃতি মূল্যবোধকে দৃঢ় করে না—এই সত্যটি আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিক্ষণ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *