বাংলা নাটকের উদ্ভব ও বিকাশ এবং নাটকের সংজ্ঞার্থ, বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য প্রসঙ্গে

Spread the love

সৈয়দ আমিরুজ্জামান,

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ : সাহিত্য রচনার একটি বিশেষ রূপশ্রেণি (genre) হলো নাটক। প্রাচ্য নাট্যশাস্ত্রে একে দৃশ্যকাব্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। গ্রিক ভাষা থেকে আগত ‘ড্রামা’ শব্দটির অর্থ হলো ‘অ্যাকশন’ তথা কিছু করে দেখানো। বাংলা ‘নাটক’, ‘নাট্য’ ‘নট’, ‘নটী’ প্রভৃতি শব্দও উদ্ভুত হয়েছে ‘নট’ ধাতু থেকে- যার অর্থ ‘নড়া-চড়া করা’। অর্থাৎ নাটকের মধ্যে এক ধরনের গতিশীলতা রয়েছে যা একটি ত্রিমাত্রিক শিল্পকাঠামো গড়ে তোলে। বলে রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমান সময়ে নাটক পরিবেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম টেলিভিশন হলেও মঞ্চই নাটকের প্রকৃত ও যথার্থ পরিবেশনা-স্থল। তাই নাটক বিষয়ক এই আলোচনায় মঞ্চনির্ভর নাট্য-বৈশিষ্ট্যই কেবল বিবেচনা করা হবে। প্রকৃতপক্ষে নাটকের মধ্যে একটি সামষ্টিক শিল্প-প্রয়াস সম্পৃক্ত থাকে। এতে কুশীলবগণ দর্শকদের উপস্থিতিতে মঞ্চে উপনীত হয়ে গতিময় মানব-জীবনের কোনো এক বা একাধিক বিশেষ ঘটনার প্রতিচ্ছবি অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। সাধারণভাবে, নাটকে যে চারটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয় তা হলো; কাহিনি বা প্লট (Plot), চরিত্র, সংলাপ ও পরিপ্রেক্ষিত। একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটকে ঘিরে শিল্প-ঘন কাহিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং সহায়ক বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপকে আশ্রয় করে উপস্থাপিত হবার প্রয়াস পায় নাটকে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নৃত্য-গীত, আবহ সংগীত, শব্দ সংযোজন, আলোক সম্পাত, মঞ্চ-কৌশল প্রভৃতি।
তবে, এটি নাটক সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা মাত্র। দু-হাজার বছরেরও বেশি বয়সী এই শিল্প মাধ্যমে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। অ্যারিস্টটল কিংবা শেকসপিয়রের কালে সময়ের ঐক্য, স্থানের ঐক্য ও ঘটনার ঐক্য নিশ্চিত করা ছিল নাটক রচনার পূর্বশর্ত; কীভাবে কাহিনমুখ (exposition), কাহিনির ক্রমব্যাপ্তি (rising action), চূড়াস্পর্শী নাট্যদ্বন্দ্ব (climax), গ্রন্থিমোচন (falling action) এবং যবনিকাপাত (conclusion)-এর মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে নাটক শুরু থেকে সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাবে- তা-ও ছিল বিশেষভাবে কাঠামোবদ্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন পাল্টেছে। নাটক যেহেতু জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিচ্ছবি সেহেতু এই রূপশ্রেণির মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেও এতে নানাবিধ পরিবর্তন এসেছে। আধুনিককালে অনেক নাটকেই কোনো বৃত্ত থাকে না, কেবল একটি চরিত্র নিয়েও রচিত হয়েছে অসংখ্য সফল নাটক; এমনকি সংলাপ ছাড়াও নাট্য-নির্মাণ অসম্ভব নয়। তবে উল্লিখিত কাঠামোবদ্ধ বৈশিষ্ট্যগুলো একজন নাট্যকারের পক্ষে যথার্থভাবে আয়ত্ত করা সম্ভব হলেই কেবল নাটকের সংগঠনে বিচিত্র মাত্রা যোজনা করা সম্ভব।
নাটকের সঙ্গে অন্যান্য সাহিত্যমাধ্যমে পার্থক্য কী-তা নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আলোচনা হয়ে আসছে। মহাকাব্য ও নাটকের পার্থক্য নিয়ে গ্রিক সাহিত্যতাত্ত্বিকগণ আলোচনা করে গেছেন। নাটকের সঙ্গে যে সাহিত্য-মাধ্যমের সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড় সেই উপন্যাস থেকে নাটক কীভাবে স্বতন্ত্র-সেই বিষয়েও নানা মনীষী আলোকপাত করেছেন। তবে, উপন্যাস ও নাটকের পার্থক্য এক সময় যত প্রকটই থাকুক, উপন্যাস-রীতির পরিবর্তন সাধনে যে অসামান্যতা এসেছে তাতে বর্তমান কালে নাটক ও উপন্যাস একে অপরকে নানাভাবে পরিপূরণ করছে। প্রসঙ্গত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয়।
১. কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ এবং গতি নাটক ও উপন্যাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য;
২. মানব মনস্তত্ত্ব, প্রেম, মহত্ত্ব, দ্বেষ, ঈর্ষা, লোভ ও অন্যান্য মৌলিক প্রবৃত্তিসমূহের দ্বন্দ্বজটিল উপস্থাপন উভয় শিল্পের প্রতিপাদ্য বিষয়;
৩. এই দুই শিল্পমাধ্যমেই মিলনান্ত কিংবা বিয়োগান্ত কিংবা উভয়ের সমন্বিত পরিণাম দেখতে পাওয়া যায়;
৪. উভয় সাহিত্য রূপশ্রেণিই কেবল পাঠের (অধ্যয়ন করে) মধ্য দিয়েও সিদ্ধ উদ্দেশ্যের চরিতার্থতা দান করতে পারে; এ সকল বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, নাটক একটি বিশেষ শিল্পরীতি যা উপস্থাপনা, ক্রিয়া ও সংলাপের ভিত্তিতে উপন্যাস থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে পৃথক। বলা যেতে পারে নাটক সাহিত্য হয়েও এর চেয়ে আরও বেশিকিছু। এর সঙ্গে দর্শকের রুচি-চাহিদা, রঙ্গমঞ্চের ব্যবস্থাপনা ও অভিনয়-কৌশল অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত। প্রথাগতভাবে, নাটকে ঘটনা সন্নিবেশ নিমিত্ত একটি বিশেষ রীতি অনুসরণ করা হয়। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ঘটনার বিকাশ থেকে পরিণতি ধাপে ধাপে সংঘটিত হতে থাকে। বলা প্রয়োজন যে, নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ঘটনার বিকাশ থেকে পরিণতি ধাপে ধাপে সংঘটিত হতে থাকে। বলা প্রয়োজন যে, নাটকের শরুতেই একটি দ্বন্দ্বের আভাস দেওয়া থাকে, যা মূলত নাটকটিকে পরিণতি মুখী করে তুলবার বীজশক্তিকে ধারণ করে। নাটক যত এগিয়ে যায় সেই দ্বন্দ্বও ক্রমে ক্রমে ঘনীভূত রূপ লাভ করে একটি উত্তুঙ্গ অবস্থানে পৌছে। নাটকের এই দ্বন্দ্ব নিজ গতিপথের দিক থেকে বিপরীতমুখী প্রবণতায় প্রতিভাত সত্যগুলিকেই আসলে রূপ দিতে সাহায্য করে। তাই বলা যায় যে, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি এবং তার শিল্পসফল পরিসমাপ্তি নাটকের বিশেষ লক্ষণ।
নাটকের শ্রেণিবিভাগের বিষয়টি বিবেচনা করলে একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভাজন সম্ভব। তবে, মুখ্যত নাটককে ট্রাজেডি, কমেডি, মেলোড্রামা, ট্রাজিকমেডি এবং প্রহসন-এই পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে ট্রাজেডিকেই সর্বোচ্চ আসন প্রদান করা হয়েছে; এমনকি কখনও কখনও নাটক বলতেই ট্রাজেডিকেই বোঝানো হয়েছে। প্রথমেই ট্রাজেডি বিষয়ে সাধারণ ধারণা অর্জন করা প্রয়োজন।
ট্রাজেডি: দেবদেবীর উদ্দেশ্যে ছাগল-ভেড়া প্রভৃতি বলি দেওয়া উপলক্ষে অনুষ্ঠিত অভিনয় থেকে ‘ট্র্যাজেডি’র জন্ম হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে ট্রাজেডি নাটকের মূলে রয়েছে ব্যক্তি-আত্মার দ্বন্দ্ব-বিক্ষুদ্ধ তীব্র যন্ত্রণা আর হাহাকার। ট্রাজেডির সংজ্ঞার্থ প্রদান করতে গিয়ে অ্যারিস্টটল যা বলেছেন, তা আজও সাহিত্য সমালোচনায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এস. এইচ. বুচার অনুদিত অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পোয়েটিক্স’ (৩৫০ পূর্বাব্দ) গ্রন্থে বলছেন: Tragedy, then, is an imitation of an action that is serious, complete, and of a certain magnitude; in language embellished with each kind of artistic ornament, the several kinds being found in separate parts of the play; in the form of action, not of narrative; through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions.
নায়ক কিংবা নায়িকামুখ্য করুণ রস পরিবেশন ট্র্যাজেডির ধর্ম। এখানে রসই প্রধান ট্রাজেডির ধর্ম। এখানে রসই প্রধান। ট্রাজেডির ধর্ম হলো কোনো জটিল ও গুরুতর ঘটনার আশ্রয়ে বিশেষ ধরনের রসসঞ্চার যা আমাদের অনুভূতিকে অভূতপূর্ব আবহে আলোড়িত করবে। এটি জৈব ঐক্যবিশিষ্ট হবে অর্থাৎ, এর একটি একক অটুট আকার থাকবে। সেইসঙ্গে, এর ভাষা হবে সাংগীতিক গুণসম্পন্ন। দ্বন্দ্বপূর্ণ কাহিনির এতে বিশেষ ভূমিকা থাকলেও গঠনগত দিক থেকে এতে নাট্যক বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। সর্বোপরি তা একদিকে দর্শকের মনে করুণা ও ভয়ের সঞ্চার করবে; আবার অপরদিকে এক ধরনের প্রশান্তিও জাগাবে। কেননা, নাটকে শত-বিপর্যয় সত্ত্বেও নায়কের যে সুদৃঢ় মহিমান্বিত অবস্থান রূপায়িত হবে তা দর্শককে বিস্ময়ঘন আনন্দ প্রদান করবে; একইসঙ্গে যে বিপর্যয় দর্শক দেখবেন তা তাঁকে এই বলে স্বস্তি দেবে যে, অন্তত দর্শকের নিজের জীবনে তা ঘটেনি। এতে দর্শকের ভাবাবেগের মোক্ষম বা বিশেষ প্রবৃত্তির পরিশোধন ঘটাবে। প্রাচীন গ্রিক ট্রাজেডিতে ‘নিয়তির’ বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। মানুষ দৈবের কাছে কতটা অসহায়, দৈবের দুর্বিপাকে মানুষ কীভাবে চরমহতভাগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয় এবং বেঁচে থেকে মৃত্যুময় যন্ত্রণা ভোগ করে- তা-ই নানা বৈচিত্র্যে গ্রিক ট্রাজেডিতে শিল্পরূপ লাভ করেছে। এই নিয়তি অতীতে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে কোনো মানুষের দ্বারা সংঘটিত কোনো অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাকে গ্রাস করে। যাকে গ্রিক ট্রাজেডিতে বলা হয়েছে নেমেসিস। অর্থাৎ মানুষ কোনোভাবেই নেমেসিসকে এড়াতে পারে না-এই বিশ্বাস গ্রিক ট্রাজেডির মর্মবাণী। সাধারণভাবে, হত্যা, মৃত্যু ভাগ্য বিপর্যয়, ভ্রান্তি এইসব উপাদানেই প্রাচীন ট্র্যাজেডি সার্থকতা লাভ করেছে। তবে, এতে মানুষের সত্তার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা অস্বীকৃত। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে ইংরেজ নাট্যকার শেকসপিয়ার ট্র্যাজেডির এক ভিন্ন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজ পর্যন্ত এই আদর্শই বহুবিচিত্র নাট্যক কাঠামোকে আশ্রয় করে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শেকসপিয়ারের নায়ক-নায়িকা প্রায়শই নিজেদের কৃতকর্মে বিবেচনাগত ভুল বা error of judgement-এর জন্ম দেয়। আর পরিণতিতে তা-ই তাদেরকে চরম মৃত্যুর যন্ত্রণায় নিপতিত করে। অর্থাৎ দৈব নয়, মানুষের দুর্ভাগ্যময় পরিণতির কারণ মানুষ নিজেই-এই চিরায়ত সত্য দর্শক শেকসপিয়রীয় ট্রাজেডির মাধ্যমে বারবার উপলব্ধি করে। তবে যে ধরনের ট্রাজেডিই হোক না কেন, নায়ক কিংবা নায়িকার দুর্ভোগ বা sufferings সমভাবে পরিলক্ষিত হয়। আর এর মধ্য দিয়েই ট্র্যাজেডি ভয়াবহতা-মিশ্রিত করুণরস সৃষ্টি করে। সফোক্লিস রচিত ‘আন্তেগোনে’, ‘আদিপাউস’, ‘ইস্কিলুসের আগামেমনন’, শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’, ‘ম্যাকবেথ’ প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত ট্রাজেডি নাটক।
কমেডি : অন্যান্য নাট্যশ্রেণির মধ্যে কমেডির পরিসমাপ্তি অানন্দে বা মিলনে।
মেলোড্রামা : একে অতি নাটকও বলা চলে। মেলোড্রামায় আবেগের উৎকট প্রাধান্য থাকে। এটিও বিয়োগান্ত নাট্যপ্রকার তবে, এতে ট্রাজেডির মতো কোনো উত্তঙ্গ নান্দনিকতা সঞ্চারিত হয় না। কখনও কখনও নাট্যিক দ্বন্দ্ব অস্পষ্ট রয়ে যায় কিন্তু আবেগের তীব্রতা দিয়ে এই শ্রেণির নাটক দর্শকের হৃদয়কে আন্দোলিত করতে চায়। প্রায়শই দুর্বল ট্রাজেডি নাটক মেলোড্রামায় পর্যবসিত হয়।
ট্রাজিকমেডি: এতে ট্রাজেডির গুরুগম্ভীর পরিবেশকে খানিকটা লঘু করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন হাস্যরস সম্পৃক্ত করা হয়। এর প্রকৃতি ও প্রবণতা সম্পর্কে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞার্থ কিংবা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে, ট্রাজিকমেডির ধারণাকে নাট্যলক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে অনেক নাট্যকার dramatic relief হিসেবে ট্রাজেডি নাটকে স্বল্প পরিসরে ব্যবহার করে থাকেন।
প্রহসন: মেলোড্রামা কিংবা ট্রাজিকমেডি থেকে প্রহসন বিভিন্ন মাপকাঠিতেই পৃথক। সমাজ বা ব্যক্তির দোষ-অসংগতি বিশেষভাবে দেখাবার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রকার ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপমূলক নাটক রচিত হয়। এর বিষয় হিসেবে কোনো গভীর বা মৌলিক সমস্যাকে বেছে নেওয়া হয় না; কিংবা নিলেও তাকে সেই মাত্রার গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করা হয় না। ব্যষ্টি বা সমষ্টির ভ্রান্তি অসংগতি দুর্বলতার চিত্রসমূহ প্রহসনের বিষয় ও মাধ্যম হিসেবে অন্বিষ্ট হয়। নাটকের চরিত্রসমূহের হাস্যকর ক্রিয়া, নির্বুদ্ধিতা এবং কৌতুককর সংলাপ এই শ্রেণির রচনার মুখ্য বৈশিষ্ট্য।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বনাট্যসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাটকের নাম স্মরণ করা যেতে পারে। ইসকাইলাসের ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’, সফোক্লিসের ‘দি কিং অদিপাউস’, ভরভূতির ‘স্বপ্ন বাসবদত্তা’, কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’, শোকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’, গ্যেটের ‘ফাউস্ত’, ইবসেনের ‘দি ডলস্ হাউজ’, স্ট্রিন্ডবার্গের ‘দি ড্রিম প্লে’, জর্জ বার্নার্ড শ-এ ‘ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান’, চেখভের ‘দি চেরি অরচার্ড’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকবরী’, ম্যাক্সিম ‘দি লোয়ার ডেপথ’, ব্রেশট-এর ‘দামার কারেজ’ প্রভৃতি।

বাংলা নাটকের উদ্ভব ও বিকাশ
আধুনিক বাংলা নাটকের বিকাশে পাশ্চাত্য বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের ভূমিকা সবিশেষ। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে যে নবীন জীবানানুভব শিক্ষিত বাঙালিকে স্পর্শ করেছিল এবং যে নবজাগরণের সূচনা ঘটেছিল, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার অন্যতম প্রকাশ ওই সময়ের প্রহসন; যার যথার্থ পরিণতি- বাংলা নাটক। উনিশ শতকের এক দ্বন্দ্বক্ষুদ্ধ পরিবেশে বাংলা নাট্যমঞ্চের বিকাশের ধারাবাহিকতায় জন্ম নিল আধুনিক বাংলা নাটক। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে প্রথম বাংলা নাটকের অভিনয় হয় ১৭৯৫ সালের ২৭শে নভেম্বর তারিখে। হেরাসিম লেবেদেফ, তার ভাষা- শিক্ষক গোলকনাথ দাসের সাহায্যে, ‘ছদ্মবেশ’ (The disguise) নামক ইংরেজি থেকে অনূদিত নাটকের পাশ্চাত্য ধাঁচের মঞ্চায়ন করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু থিয়েটারে ও ১৮৩৫ সালে শ্যামবাজারের নবীনচন্দ্র বসুর নিজ বাড়িতেও বিলিতি ধরনের রঙ্গমঞ্চের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। তবে ১৮৫৭ সালে জানুয়ারি মাসে অনুবাদ নাটকের পরিবর্তে নন্দকুমার রায়ের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলা’ প্রথম বাংলা নাটক হিসাবে অভিনীত হয়। এ পর্যায়ের নাটকের মধ্যে আরও উল্লেখ্য ১৮৫৭ সালে রামজয় বসাকের বাড়িতে অভিনীত রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’। বাংলা নাটকের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে পাইকপাড়ার রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ এবং রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহের বেলগাছিয়া বাগান বাড়িতে। স্থাপিত নাট্যশালায়। ১৮৫৮ সালে ‘রত্নাবলী’ নাটক দেখতে এসে সদ্য মাদ্রাজফেরত মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর মান দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং তার ফলস্বরূপ বাংলা সাহিত্য তাঁর হাত থেকে পেয়ে যায় প্রথম সার্থক বাংলা নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। মধুসূদনের মেধাস্পর্শে বাংলা নাটকের বিষয়, সংলাপ, আঙ্গিক মঞ্চায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। নবজাগ্রত বাঙালির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠা এই নাট্যধারা ‘নব নাটক’ হিসেবে সবিশেষ পরিচিত। মধুসূদন, দীনবন্ধু এই সব নাটককে করে তুললেন অনেক বেশি রুচিসম্মত ও নান্দনিক। এরই ধারাবাহিকতায় গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ নাট্যকারের আবির্ভাব ঘটে বাংলা নাটকের অঙ্গনে; বিকশিত হতে থাকে বাংলা নাট্যধারা। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব ও আঙ্গিককে-নিরীক্ষার প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা নাটকে যোগ করেন বিশ্বমানের স্বাতন্ত্র্য। বিশ শতকের সাহিত্যে অমোঘ প্রভাব বিস্তারকারী দুই বিশ্বযুদ্ধ এসময়ের নাটককে নতুন চিন্তা ও আঙ্গিকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। এরই সঙ্গে রুশ বিপ্লব, ভারতবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদের বিস্তার, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, দেশভাগ, শ্রেণিসংগ্রামচেতনা, শ্রেণিবিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি বাংলা নাটকে সূচনা করে গণনাট্যের ধারা। বিজন ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত প্রমুখ নাট্যকার এই নতুন ধারার নাটক নিয়ে জনমানুষের কাছে পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। এর কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা, পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা শোষণ ও বৈষম্য, এই অঞ্চলের নাট্যকারদেরও গণনাট্রের চেতনায় অনুপ্রাণিত করে তোলে। সেইসঙ্গে, পূর্ববাংলায় একের পর এক আন্দোলনের পটভূমি স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের নিজস্ব নাট্যধারা সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেয়।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বাংলা নাটকের নাম নিম্নরূপ : রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’, মধুসূদন দত্তের ‘কৃষ্ণকুমারী’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’, ‘সধবার একাদশী’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘জমিদার-দর্পণ’, গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘প্রফুল্ল’, রীবন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’, বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’, তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়াতার’, উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’ প্রভৃতি। বাংলা নাটকের এই সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার বহন করে বাংলাদেশেরও একটি নিজস্ব নাট্যধারা’ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটকের কথা স্মরণ করা যেতে পারে; যেমন : নুরুল মোমেনের ‘নেমোসিস’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহিপীর’, মুনীর চৌধুরীর ‘চিঠি’, আনিস চৌধুরীর ‘মানচিত্র’, সাইদ আহমদের ‘মাইলস্টোন’, ‘কালবেলা’, মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘রাজা অনুস্বারের পালা’, ‘কি চাহ শঙ্খচিল’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, জিয়া হায়দারের ‘শুভ্র সুন্দর’, ‘কল্যাণী আনন্দ’, ‘এলেবেলে’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’, মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’, ‘গিনিপিগ’, সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, এম এম সোলায়মানের ‘তালপাতার সেপাই’, ‘ইংগিত’ প্রভৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *