প্রতি ১০০ বছরে একটি মহামারী: ১৭২০ প্লেগ, ১৮২০ কলেরা, ১৯২০ স্প্যানিশ ফ্লু, ২০২০ করোনাভাইরাস

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা’

ঢাকা, ১৮ মার্চ ২০২০: বিশ্বে প্রতি ১০০ বছর অন্তর একটি করে মহামারীর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বিগত ৩০০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, ১৭২০ সালে প্লেগ, ১৮২০ সালে কলেরা, ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী হয়েছে। চীনের বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারী উল্লিখিত মহামারী গুলোর মতো একই ধাঁচ অনুসরণ করেছে। কিন্তু ইতিহাস সত্যিই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসটি কি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল? নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ?

মহামারীগুলির ইতিহাস কি বলে:

১৭২০ সাল:

১৭২০ সালে বুবোনিক প্লেগ

১৭২০ সালে বুবোনিক প্লেগ বৃহৎ আকারের মহামারী ছিল, এটি মার্সেইয়ের দুর্দান্ত প্লেগও বলে। রেকর্ডগুলি দেখায় যে ব্যাক্টেরিয়া মার্সেইলে প্রায় ১লাখ মানুষ মারা গেছিলো । ধারণা করা হয় যে এই ব্যাক্টেরিয়া সংক্রামিত মাছি দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে।

১৮২০ সাল:

১৮২০ সালে কলেরা

থাইল্যান্ডে কলেরা মহামারী প্রথম ধরা পড়েছিল ১৮২০ সালে , ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে সহ এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮২০ সালে এই জীবাণুটির কারণে এশিয়ায় ১লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৮২০ সালের মহামারী দূষিত নদীর পানি খাওয়ার কারণে শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়।

১৯২০ সাল:

১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু

১০০ বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু দেখা দিয়েছিল, সেই সময় লোকেরা এইচ 1 এন 1 ফ্লু ভাইরাসের সাথে লড়াই করছিল। ক্রমাগত স্প্যানিশ ফ্লু জিনগতভাবে পরিবর্তন হতো যার ফলে ভাইরাসটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছিল। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল এবং বিশ্বের ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলো , ১৯২০ সালের মহামারীটি ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা ছিল।

২০২০ সাল:

২০২০ সালে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস

দেখে মনে হয় ইতিহাস প্রতি ১০০ বছর পরে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে, এটি কি কেবল কাকতালীয় ঘটনা? আজ, চীন সহ সারা বিশ্বজুড়ে একটি বড় মহামারীর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, চীন পুরো পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

চীন হওয়া এই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসটি ইতিমধ্যে সারা বিশ্ব ছড়িয়ে পড়েছে। দুনিয়াজুড়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওমিটারস ডট ইনফো’র হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় ১৫ মার্চ সকাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৫৬ হাজার ৩৯৬। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছে ৭৫ হাজার ৯২২ জন।

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসের কারণে থমকে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ঘরের ভেতরেই থাকতে হচ্ছে বিশ্বের প্রায় ১৪৫টি দেশের মানুষকে। সবাই এক রকম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। ইতালিতে এখন ঘরে ঘরে কারাগারের মতো অবস্থা। সরকারি নির্দেশে দেশটির সবাই এখন স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। অবরুদ্ধ ইতালিতে বন্দিজীবনে অলস সময় পার করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। জীবন যেন থমকে গেছে। সুস্থ থাকলেও ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

উৎপত্তিস্থল চীনে সরকারি হিসাবেই এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ৮২৪। এর মধ্যে তিন হাজার ১৯৯ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছে ৬৬ হাজার ৯১১ জন।

ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ১৫৭। এর মধ্যে এক হাজার ৪৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছে এক হাজার ৯৬৬ জন।

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ওপরের সারিতে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের নাম উল্লেখযোগ্য।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে দেশজুড়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইতালির সরকার। বন্ধ রয়েছে স্কুল। স্থগিত করা হয়েছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। খেলাধুলার অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। জনসমাগম স্থল এখন পুরো ফাঁকা। ওষুধ ও খাবারের দোকান বাদে সব কিছু বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া ভ্রমণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে বাবা-মাকে কাছে পাচ্ছে তাদের সন্তানরা। ইউরোপের দেশগুলোতে যে চিত্র খুবই কম চোখে পড়ে। বন্দি অবস্থায় কেমন আছে সেখানকার মানুষগুলো।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় সান ফিয়োরানো শহরে বসবাসরত স্কুলশিক্ষক মারজিও টনিওলো বলেন, মৌলিক প্রয়োজন ও জরুরি কাজ ছাড়া বর্তমানে বাড়ি থেকে কেউ বের হতে পারছেন না। যে কোনো ক্ষেত্রে, জরুরি প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ দিয়ে তবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে।

মারজিওর ছোট্ট মেয়ে বিয়ানকা টানিওলো বাড়িতে বসে কখনও করোনাভাইরাসের ছবি আঁকছে, আবার কখনও পুতুল নিয়ে খেলছে। বাড়ির বাইরের লনে পুতুলের সঙ্গে চড়ূইভাতি করেও সময় কাটছে শিশুটির। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সান ফিয়োরানো শহরটিই প্রথম নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে কর্মস্থলের প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “গুজব বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেতন হওয়ার অাহবান জানাচ্ছি।
১. পৃথিবীর অন্যতম ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের জন্য বিমানবন্দরের চাইতেও অনেক ক্ষেত্রে স্থল ও নৌবন্দরগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কেননা আমদানি-রপ্তানির জন্য আমরা এই বন্দরগুলো বেশি ব্যবহার করে থাকি। সুতরাং বিমানবন্দরে নজরদারি জারি রাখার পাশাপাশি স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে সরকারের অস্থায়ী মেডিকেল পোস্ট স্থাপন ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা উচিত।
২. ঢাকা শহরের কিছু হাসপাতাল এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কিছুটা প্রস্তুত হলেও সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য অপ্রতুল। গত বছর ঢাকার বাইরে যেভাবে ডেঙ্গুর বিস্তার হয়েছে তাতে করে দেশের সবগুলো জেলা শহরে ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক হাসপাতাল ও মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা দরকার। যেহেতু বিদেশ প্রত্যাগত শ্রমিক ও প্রবাসীরা বেশিরভাগ সময়ে সরাসরি গ্রামে চলে যান, তাই তারা যাতে আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক সেবা ও পরামর্শ পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর করোনা ভাইরাস বিষয়ক জরুরি তথ্য-উপাত্ত নিয়মিত প্রচার করা জরুরি। এছাড়াও বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলে সব রোগীকে ভর্তি করে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো পর্যাপ্ত বেড আমাদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নেই। তাই এই ক্ষেত্রে বর্তমানে ক্যানাডার গৃহীত পদক্ষেপ ‘self-isolation’ কার্যকরী হতে পারে। এই ক্ষেত্রে রোগী করোনাভাইরাস পজিটিভ হলে সে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ১৪ দিনের জন্য নিজ ঘরে বিচ্ছিন্ন থাকবে। এমতাবস্থায়ও প্রয়োজনের সময় তৎক্ষণাৎ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা দরকার।
৪. সরকার চীনে প্রচুর হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিসু, টয়লেট পেপার পাঠিয়েছিলো, যা প্রশংসনীয়। নিজের দেশের জনগণও যাতে তাদের প্রয়োজনীয় মাস্ক, স্যানিটাইজার, সাবান, টিসু, টয়লেট পেপার ইত্যাদি প্রয়োজনের সময় পায়, সেই ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে।
৫. বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের সরকার যেভাবে মানুষকে self-isolation, অর্থাৎ নিজের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে বলছে, তাতে করে মানুষ বাজার-ঘাটে কম যেতে চাইবে, এবং ফলশ্রুতিতে জিনিসপত্র কিনে ঘরে রেখে দিতেও চাইবে। সরকারকে মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে যে নিয়মিত হাত ধুলে, ঘরের বাইরে কিছু স্পর্শ না করলে, বা স্পর্শ করে নাক-মুখ-চোখ ধরার আগে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিলে কোন চিন্তা নেই। সেইক্ষেত্রে একবারে একমাসের বাজার করে রাখারও প্রয়োজন নেই। ৬. ইরান বা যুক্তরাজ্যে সরকারের শীর্ষ এমপি, মন্ত্রীরা করোনাতে আক্রান্ত হয়েছেন। এটাকে ভয় হিসেবে না দেখে সরকারের দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের করোনা টেস্ট করে মানুষকে রিপোর্ট জানানো উচিত স্বচ্ছতার খাতিরে। মিডিয়া হাউজগুলোও নিজ উদ্যেগে নিজেদের করোনা টেস্ট করে পত্রিকার মাধ্যমে মানুষকে জানাতে পারে।
৭. এই প্যানডেমিকে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কিন্তু কোনো মুক্তি নেই। তারা চাইলেও নিজেদের self-isolation এ নিতে পারবেন না, যেমনটি পারেননি ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও। তাই ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা কিংবা জনস্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন, আস্থা রাখুন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান। তারা যাতে নিজেদের অসহায়বোধ না করেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *