ক্যাসিনোর মতো পেঁয়াজের বাজারেও শুদ্ধি অভিযান চান ক্রেতারা

Spread the love

রাজধানীর শনিরআখড়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। শনিবার এক কেজি পেঁয়াজ কিনেছেন ১২০ টাকায়। গতকাল রবিবার ওই একই পেঁয়াজ কেনেন ১২৫ টাকায়। অথচ সেপ্টেম্বর মাসে তিনি প্রতি কেজি পেঁয়াজ কিনেছিলেন ৪০ টাকায়। শুধু ভারতের রপ্তানিমূল্য বৃদ্ধি ও রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে দেড় মাসের ব্যবধানে ব্যবসায়ীদের নৈরাজ্য দেখছেন সাধারণ ক্রেতারা। কিন্তু ক্রেতাদের স্বার্থ সংরক্ষণে বৈঠক আর কথামালা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দৈনিক আমাদের সময়

রাজধানীর মুগদার বাসিন্দা রূপা বেগম জানান, প্রতিদিনই বাড়ছে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে এই বাড়াবাড়ি দেখার কেউ যেনো নেই। সপ্তাহ দু-এক আগেও তিনি প্রতিকেজি পেঁয়াজ কিনেছেন ৮০ টাকায়। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই পেঁয়াজের মূল্য ১২০-১২৫ টাকায় উঠেছে। মনে হচ্ছে বাজার মনিটরিংয়ে কেউ নেই। বেশিরভাগ ক্রেতারই দাবি ক্যাসিনোর মতো পেঁয়াজের বাজারেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। তবেই যদি নিয়ন্ত্রণে আসে পেঁয়াজের বাজার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল করতে দফায় দফায় বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়েই চলেছে। পেঁয়াজ কিনতে গলদঘর্ম অবস্থা নিম্নআয়ের মানুষের। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না টিসিবির ট্রাকের পেঁয়াজ। অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি শনিবার রংপুরে পেঁয়াজের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সে পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরের দিন পাইকারি বাজারেই প্রতিকেজি পেঁয়াজের মূল্য ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীনের সঙ্গে সচিবালয়ে নিজ কক্ষে দেখা করতে গেলে তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।
টিপু মুনশি বলেছেন, অনেক অসাধু ব্যবসায়ী একটু সমস্যা দেখা দিলেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তারা যেন পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য মনিটরিং টিম কাজ করছে। ২৬ লাখের বিপরীতে দেশে প্রায় ১৮ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকেই আমদানি হয় বেশি। এবার তারা হঠাৎ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। আগামী সপ্তাহে মিসর থেকে পেঁয়াজের চালান আসার কথা। তখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে নেই কোনো কার্যকর নজরদারি। সরকারি সংস্থা টিসিবির খোলাবাজার পদক্ষেপও কমাতে পারছে না পেঁয়াজের উত্তাপ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পেঁয়াজের এ দামের নৈরাজ্য ঠেকাতে বেশকিছু অভিযান পরিচালনা করেছে। অন্তত দুই হাজার বিক্রেতাকে শাস্তি দিয়েছে তারা। কিন্তু এর পরও মিলছে না সুফল। অতিরিক্ত দামে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ভোক্তাসাধারণ।
চলতি সপ্তাহে আরেক দফা দাম বেড়ে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি দরে। গত শুক্রবার পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিতে ৫ টাকা বাড়ার পর গতকাল রবিবার পেঁয়াজের দাম আবারও পাঁচ টাকা বেড়েছে। কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, খিলগাঁওসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মালিবাগ বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মো. সোহেল জানান, রবিবার সকাল থেকেই দেশিসহ সব ধরনের পেঁয়াজের দাম পাঁচ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগের দিন যা ছিল ১১৫ টাকা। তবে নি¤œমানের পেঁয়াজের কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ নেই বললেই চলে। কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হালিম জানান, গতকাল রবিবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা কেজি এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ১১৮ থেকে ১২০ টাকা এবং মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়।

অন্যদিকে রাজধানীর মুদি দোকানে ১২২ থেকে ১২৫ টাকা দরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ মিলছে, এলাকার দোকানগুলো যে যেমন পারছে দাম রাখছে। এদিকে পেঁয়াজের দাম বেশ ওঠানামা করেছে। ১৮ আক্টোবর কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজের দাম হয় ১০০ থেকে ১১০ টাকা। দেশি পেঁয়াজের সংকট ও ভারতীয় পেঁয়াজ শেষ দেখিয়ে ২৫ অক্টোবর শুক্রবার পেঁয়াজের দাম আরেক দফা বাড়ে। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে দাম হয় ১১০ থেকে ১২০ টাকা। একই হারে বাড়ে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামও। সর্বশেষ ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর দুই দফায় দাম বেড়ে বর্তমানে বাজারে দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি। মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। কোথাও কোথাও এলাকার খুচরা দোকানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে কারওয়ান বাজারের বিক্রমপুর বাণিজ্যালয়ের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়েজ বলেন, গতকাল বিকাল থেকে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে আবার পাঁচ টাকা বেড়েছে। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহে পাইকারি বাজারে দুবার কেজিতে পাঁচ টাকা করে বেড়েছে। বর্তমানে দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি করছি ১১৫ টাকা কেজি দরে। ছোট আকারের ও একটু নি¤œমানের ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি করছি ১০৭ টাকায়। এ ছাড়া মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি করছি ১০৫ টাকা কেজি।

একই চিত্র রাজধানীর অন্য এলাকার পাইকারি বাজারেও। তবে মালিবাগ ও খিলগাঁও এলাকার পাইকারি দোকানে মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে একটু বেশি দামে। মালিবাগ বাজারের খোরশেদ বাণিজ্যালয়ের পাইকার ব্যবসায়ী মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, দেশি আর বিদেশি নেই। বাজারে ভালো মানের সব পেঁয়াজের দাম একই। বাজারে দেশি ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ দুটাই ১১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি।
শ্যামবাজারের পাইকারি বাজারে তুলনামূলক অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে মিয়ানমারের পেঁয়াজ। সেখানে ১০৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। শ্যামবাজারের মা বাণিজ্যালয়ের পাইকারি ব্যবসায়ী মিলন কান্তি বলেন, বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ একেবারেই নেই, দেশি পেঁয়াজও শেষের পথে। উল্টোদিকে মিয়ানমারের পেঁয়াজের সরবরাহ সন্তোষজনক না হলেও বর্তমানে এটিই একমাত্র ভরসা। তাই বিভিন্ন বাজারে বিভিন্ন দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে ঢাকার অন্যতম পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান লাকসাম বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বাজারে সত্যিই পেঁয়াজ নেই। যা আছে তার সিংহভাগই মিয়ানমারের। দেশি পেঁয়াজ প্রায় শেষ বলতে গেলে। তাই দাম বেড়েই চলেছে।
এদিকে দেশের বৃহত্তর ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পেঁয়াজ আমদানি করার কথা থাকলেও এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে নতুন করে পেঁয়াজ আমদানি। এ বিষয়ে আমদানিকারকদের দাবি, এসব লোক দেখানো মাত্র। এ প্রক্রিয়ায় খুব বেশি একটা সুবিধা হবে না। বাজারে নতুন দেশি পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত আগামী এক মাস দাম এমন চড়াই থাকবে। পেঁয়াজের আমদানিকারক ও শ্যামবাজার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. মাজেদ বলেন, ‘আমরা যত কথাই বলি, ভারতের পেঁয়াজ আমদানি শুরু না হলে দাম কমবে না। কারণ আমরা অন্যান্য দেশ থেকে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ পাচ্ছি না। আবার আমদানিও করতে হচ্ছে চড়া দামে। পেঁয়াজের বাজারের এ অস্থিরতার শুরু হয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখ থেকে। ওই দিন ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য টন প্রতি সাড়ে ৩শ ডলার থেকে সাড়ে ৮শ ডলার করার ঘোষণা করায় ৪০ টাকার পেঁয়াজ ৭০ টাকায় উন্নীত হয়। এরপর একই মাসের ২৯ তারিখে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা দেয়। সে সময় রাতারাতি পেঁয়াজের দাম কেজি ১৩০ টাকায় উঠেছিল। কিন্তু এটি আবার কমে ৭০-৯০ টাকার মধ্যে আসে। কিন্তু তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দ্রুতই আবার ১০০ টাকা, পরের ধাপে ১১০ টাকা এবং সব শেষে গতকাল ১২৫ টাকায় উঠে আসে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা হলেও দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
ভোক্তাদের দাবি, বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। কারণ বাজারে গেলে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা যায় না। দাম যখন বেড়ে যায় তখনই সব দোকানদার একসঙ্গে বাড়ায়। এটা সম্ভব তখনই, যখন বিক্রেতারা একজোট থাকে। অন্যদিকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন আমদানিকারকদের। তাদের দাবি, মূলত আমদানিকারকরাই দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। তাদের নির্ধারিত দামের বাইরে অন্য দামে পেঁয়াজ বিক্রি সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির বলেন, খোলাবাজারে ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে টিসিবি। কিন্তু তাতেও বাজারে প্রভাব পড়ছে না। টিসিবি এখন ঢাকার ৩৫টি স্থানে ট্রাকে করে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রতিদিন এক হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বিক্রির জন্য দেওয়া হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা নেই।

টিই/এসবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *