কর্মস্থলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেভাবে ঠেকাতে বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা’

ঢাকা, ১৮ মার্চ ২০২০: করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে কর্মস্থলে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন, কর্মীদেরই–বা করণীয় কী, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। প্রথমেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের (নিয়োগদাতা) করণীয় কী, সে সম্পর্কে বলেছে ডব্লিউএইচও।

কর্মদিবস কমিয়ে আনার কথা ভাবতে বলেছে ডব্লিউএইচও। কর্মস্থল পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জোর দিয়েছে তারা। বিশেষ করে ডেস্ক, টেবিল, টেলিফোন, কি–বোর্ড ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ, ভাইরাস রয়েছে এমন স্থান ও সামগ্রীর স্পর্শে আসা কর্মীর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কর্মীদের পাশাপাশি অফিসে আসা অন্য ব্যক্তিদের ভালোভাবে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে বলেছে ডব্লিউএইচও। এ কাজটি করার জন্য কর্মীদের উৎসাহিত করতে হবে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মজুত রাখতে হবে জীবাণুনাশক ও হাত ধোয়ার সামগ্রী। এ ছাড়া করোনাভাইরাস মোকাবিলায় হাত ধোয়াসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধির পোস্টার প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে মাস্ক ও টিস্যু পেপারের সহজলভ্যতার বিষয়টিও।

অফিসে আসার পথে সরকারের ভ্রমণ পরামর্শ মেনে চলার জন্য কর্মীদের পরামর্শ দিতে হবে। কর্মী যে এলাকায় থাকেন, সেখানে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে তিনি যেন বাড়িতেই অবস্থান করেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে হবে।

ঝুঁকি কমাতে যা প্রয়োজন

খুবই জরুরি না হলে অফিসে বৈঠকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি ভাবতে হবে। বৈঠক বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তি হয়তো নিজের অজান্তেই করোনাভাইরাস বয়ে আনতে পারেন। মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে টেলিফোন কনফারেন্স বা অনলাইনে তা করা যায় কি না, সেটি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বৈঠকে উপস্থিত কেউ শুষ্ক কাশি, জ্বর, অসুস্থতা বোধ করলে তাঁর বিষয়ে দ্রুত (হাসপাতালে পাঠানো বা বাসায় রাখা) সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কর্মদিবস কমিয়ে আনতে হবে
মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে টেলিফোন কনফারেন্স বা অনলাইনে করা যেতে পারে
ডেস্ক, টেবিল, টেলিফোন, কিবোর্ড ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে
১ মিটার বা ৩ ফুটের কিছু বেশি রাখতে হবে
বৈঠক বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের সবার নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা অন্তত এক মাসের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এর ফলে বৈঠক বা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর যদি শোনা যায় কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাহলে ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা অন্যদের শনাক্ত করতে সুবিধা হবে।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

ঝুঁকি এড়াতে কর্মীদের করোনাভাইরাস সংক্রমিত এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। ভ্রমণের সময় সঙ্গে জীবাণুনাশক রাখতে হবে। হাঁচি-কাশি দেওয়া ব্যক্তিদের থেকে অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এলাকা থেকে আসার পর কর্মীদের ১৪ দিনের জন্য পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার। এমনকি সাধারণ কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও কর্মীকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, সাধারণ সতর্কতা, পরিকল্পনা ও তৎপরতাই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ, কর্মী এবং পুরো প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে কর্মস্থলের প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “গুজব বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেতন হওয়ার অাহবান জানাচ্ছি।
১. পৃথিবীর অন্যতম ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের জন্য বিমানবন্দরের চাইতেও অনেক ক্ষেত্রে স্থল ও নৌবন্দরগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কেননা আমদানি-রপ্তানির জন্য আমরা এই বন্দরগুলো বেশি ব্যবহার করে থাকি। সুতরাং বিমানবন্দরে নজরদারি জারি রাখার পাশাপাশি স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে সরকারের অস্থায়ী মেডিকেল পোস্ট স্থাপন ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা উচিত।
২. ঢাকা শহরের কিছু হাসপাতাল এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কিছুটা প্রস্তুত হলেও সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য অপ্রতুল। গত বছর ঢাকার বাইরে যেভাবে ডেঙ্গুর বিস্তার হয়েছে তাতে করে দেশের সবগুলো জেলা শহরে ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক হাসপাতাল ও মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা দরকার। যেহেতু বিদেশ প্রত্যাগত শ্রমিক ও প্রবাসীরা বেশিরভাগ সময়ে সরাসরি গ্রামে চলে যান, তাই তারা যাতে আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক সেবা ও পরামর্শ পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর করোনা ভাইরাস বিষয়ক জরুরি তথ্য-উপাত্ত নিয়মিত প্রচার করা জরুরি। এছাড়াও বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলে সব রোগীকে ভর্তি করে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো পর্যাপ্ত বেড আমাদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নেই। তাই এই ক্ষেত্রে বর্তমানে ক্যানাডার গৃহীত পদক্ষেপ ‘self-isolation’ কার্যকরী হতে পারে। এই ক্ষেত্রে রোগী করোনাভাইরাস পজিটিভ হলে সে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ১৪ দিনের জন্য নিজ ঘরে বিচ্ছিন্ন থাকবে। এমতাবস্থায়ও প্রয়োজনের সময় তৎক্ষণাৎ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা দরকার।
৪. সরকার চীনে প্রচুর হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিসু, টয়লেট পেপার পাঠিয়েছিলো, যা প্রশংসনীয়। নিজের দেশের জনগণও যাতে তাদের প্রয়োজনীয় মাস্ক, স্যানিটাইজার, সাবান, টিসু, টয়লেট পেপার ইত্যাদি প্রয়োজনের সময় পায়, সেই ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে।
৫. বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের সরকার যেভাবে মানুষকে self-isolation, অর্থাৎ নিজের ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে বলছে, তাতে করে মানুষ বাজার-ঘাটে কম যেতে চাইবে, এবং ফলশ্রুতিতে জিনিসপত্র কিনে ঘরে রেখে দিতেও চাইবে। সরকারকে মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে যে নিয়মিত হাত ধুলে, ঘরের বাইরে কিছু স্পর্শ না করলে, বা স্পর্শ করে নাক-মুখ-চোখ ধরার আগে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিলে কোন চিন্তা নেই। সেইক্ষেত্রে একবারে একমাসের বাজার করে রাখারও প্রয়োজন নেই। ৬. ইরান বা যুক্তরাজ্যে সরকারের শীর্ষ এমপি, মন্ত্রীরা করোনাতে আক্রান্ত হয়েছেন। এটাকে ভয় হিসেবে না দেখে সরকারের দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের করোনা টেস্ট করে মানুষকে রিপোর্ট জানানো উচিত স্বচ্ছতার খাতিরে। মিডিয়া হাউজগুলোও নিজ উদ্যেগে নিজেদের করোনা টেস্ট করে পত্রিকার মাধ্যমে মানুষকে জানাতে পারে।
৭. এই প্যানডেমিকে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কিন্তু কোনো মুক্তি নেই। তারা চাইলেও নিজেদের self-isolation এ নিতে পারবেন না, যেমনটি পারেননি ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও। তাই ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা কিংবা জনস্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন, আস্থা রাখুন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান। তারা যাতে নিজেদের অসহায়বোধ না করেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *