করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় চা বাগানের শ্রমিকদের ছুটি নেই, ঝুঁকিতে কয়েক লাখ মানুষ

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা’

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার), ২৮ মার্চ ২০২০ : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় জনসাধারণকে নিজ নিজ ঘরে নিরাপদে থাকার সরকারি ঘোষণা থাকলেও কাজ করতে হচ্ছে চা শ্রমিকদের। মৌলভীবাজার জেলার ৯৩টিসহ দেশের ১৬৩ চা বাগানের লক্ষাধিক শ্রমিক মজুরী ও রেশনসহ ছুটি ঘোষণা না করায় ঘরে বসে থাকতে পারছেন না। এতে ঝুঁকিতে রয়েছে চা বাগান রয়েছে এমন ৪ জেলার কয়েক লাখ মানুষ। তাদের সর্দি, কাশি, জ্বরসহ নানা রোগ লেগেই আছে, তবে এ পর্যন্ত কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। সেক্ষেত্রে বাগানে কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় নিজেরা নিরাপদ থাকতে মজুরী ও রেশনসহ ছুটি ঘোষণার দাবীতে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর, কানিহাটি, দেওছড়া, বাঘিছড়া ও ডবলছড়া চা বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরী জানান, ‘শমশেরনগরসহ ৫টি চা বাগানের শ্রমিকেরা ইতিমধ্যে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান শুরু করেছেন। তবে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। চা শ্রমিকদের সরকারি ছুটির অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে চা সংসদে লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে। আমরা দাবি করছি দ্রুত চা বাাগানে ছুটি ঘোষনা করার জন্য।’

সরেজমিন চা বাগানের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শ্রমিকরা কোন ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই টিলা ও সেকশন সমুহে কাজ করছেন। মাস্ক, গ্লাভস ছাড়াই উন্মুক্ত পরিসরে তারা কাজ করছেন। সেখানে ঘনঘন হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাত ধোয়ার জন্য কোম্পানী সাবান ও পানির ব্যবস্থা করেছে। বাগানে কাজের ক্ষেত্রে এবং নিজ নিজ বাসগৃহে গাঁ ঘেষোঘেষি করে চা শ্রমিকদের অবস্থানে রয়েছে ঝুঁকি। সেদিকে নজর দিচ্ছেন না কেউ। শ্রমিকরা বলেন, দেশের অন্য পেশার মানুষ নিরাপদে ঘরে আছেন। আর আমরা বাগানে পাতি তুলছি। তারা সরকারের কাছে ছুটি দাবি করেন। এদিকে ছুটি না পেয়ে বিভিন্ন চা বাগানে ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে শ্রমিক নেতারা জানান।

এদিকে শুক্রবার সকালে শমশেরনগর চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিকরা চা বাগান ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে গিয়ে ছুটির বিষয়ে আলাপ করেন। কিন্তু কতৃপক্ষ তাদের ছুটি দিতে রাজি হয়নি। এপর্যায়ে শমশেরনগর, কানিহাটি, দেওছড়া বাঘিছড়া ও ডবলছড়া চা বাগানে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন শ্রমিকরা। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালির (অঞ্চলের) কার্যকরি কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাশ পাইনকা ও শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রীকান্ত কানু গোপাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ন্যাশনাল টি কোম্পানী (এনটিসি) এর পাত্রখোলা চা বাগান ব্যবস্থাপক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চা বাগানে বন্ধের বিষয়ে আমরা কোন নির্দেশনা পাইনি। শ্রমিকদের পানি, স্যানিটেশন ব্যবহার, লিফলেট বিতরণ, মাইকযোগে প্রচারনার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কোম্পানীর পক্ষ থেকে মাস্ক ও সাবান বিতরণ করা হচ্ছে।’

কমলগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশেকুল হক বলেন, ’ চা শ্রমিকদের ছুটির বিষয়টি সরকারের আদেশের বাইরে। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক শ্রমিকদের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাগান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি বাগানে বহিরাগত প্রবেশ ও মদের পাট্রা বন্ধ ঘোষনা করেছেন।’
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় চা শ্রমিকদের সরকারি ছুটির অন্তর্ভুক্ত করার দাবি সমর্থন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান।

উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চা শ্রমিকদের প্রতি সরকার ও চা কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ এনে এর প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল থেকে শমশেরনগর বাজার চৌমুহনায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিকের কৃতি সন্তান মোহন রবিদাস।

তার দাবীর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন বাবুল মাদ্রাজি, সুজন লোহার, মনিসংকর রায়, উত্তম রবিদাস, রাজকুমার রবিদাসহ ওই বাগানের সব ছাত্র যুবক ও চা শ্রমিকরা। তবে জনসমাগম এড়াতে মোহন রবিদাস ব্যতিক্রমী পন্থায় এ প্রতিবাদ জানান।

মোহন রবিদাস দাবি করেছেন, করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে দেশের চা শ্রমিকরা। তিনি বলেন, ‘একজন সাদা তামাকপাতা হাতের তালুতে রেখে মললে তার কাছ থেকে নিয়ে আরও পাঁচ জনে খায়, মদের গ্লাসগুলো ধোঁয়া হয় না, সাধারণত কাপড় দিয়ে মুছে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে চা-পাতা তোলা হয় সেখানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান তো দূরের কথা খাবার পানিই থাকে না। এক ঝর্ণার পানি ১০ জনে খায়। লাইনগুলাতে ঘন বসতি বেশি। ঘরগুলো এক্কেবারে কাছাকাছি। একই নদীতে অনেক মানুষ গোছল করে। চা বাগানের গ্রুপ হাসপাতালগুলোর (ক্যামেলিয়া, কালিঘাট) দিকে তাকালে গায়ে জ্বর আসে। ডাক্তার ও নার্সদের গায়ে পিপিই নেই। প্রবাসীরা স্বাচ্ছন্দ্যে আনাগোনা করছে। চিকিৎসা নিচ্ছে।’

এসব বিষয়ে সরকার বা চা কোম্পানি কেউই কোন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন মোহন রবিদাস।

তিনি বলেন, ‘সরকার সব সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ করেছে। কিন্তু চা বাগানগুলো বন্ধে কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। উপরন্তু শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে জানিয়ে দিয়েছে, চা-বাগানগুলো সেই সাধারণ ১০ দিন ছুটির আওতায় পড়বে না।’

‘এটা একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত ও চা-শ্রমিকদের প্রতি সরকারের অবহেলা’ বলে মন্তব্য করেন মোহন।

আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব চা বাগানে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অর্থাৎ পর্যাপ্ত মাস্ক, সাবান-স্যানিটাইজার, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা, মজুরি ও রেশন ইত্যাদিসহ বন্ধ ঘোষণা না করলে আরও কঠোর কর্মসূচী হাতে নিবেন বলেও জানান তিনি।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের সব চা বাগান বন্ধ ঘোষণার দাবী প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে অামাদের প্রতিনিধিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান এই দাবীর প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, ‘চা শিল্পের জন্য প্রণোদনা তহবিলের সৃষ্টি করে সরকারীভাবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, বিশেষ করে পর্যাপ্ত মাস্ক, সাবান- হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক স্প্রে, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা, মজুরি ও রেশন ইত্যাদিসহ অাপদকালীন সহায়তা প্রদান করতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *