করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা চা শ্রমিকদের ছুটির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত : সৈয়দ আমিরুজ্জামান

Spread the love

স্টাফ রিপোর্টার” শেখ জুয়েল রানা’

শ্রীমঙ্গল, ৩১ মার্চ ২০২০: “করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা চা শ্রমিকদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং মজুরীসহ ছুটির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।” করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় নিজ নিজ ঘরে নিরাপদে থাকার সরকারি ঘোষণা চা বাগানে প্রযোজ্য না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের অসন্তোষ ও অান্দোলনের প্রেক্ষিতে জানতে চাওয়া হলে অামাদের প্রতিনিধিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান এসব কথা বলেন।
সৈয়দ অামিরুজ্জামান অারও বলেন, “গত বছর দেশের চা শিল্পের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। চা শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রমের উপর টিকে থাকা দেশের চা শিল্প এখন জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১% অবদান রাখছে।
পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের এই মহামারীর সময়েও চা শ্রমিকেরা উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে যেখানে বিভিন্ন শিল্পখাতের শ্রমিকদের স্ব-মজুরিতে ছুটি ও শিল্পের প্রণোদনা বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। লকডাউনের সময়কালে চা শ্রমিকদের ঝুঁকিতে ফেলে রাখা উচিত হয় নি। চা বাগানের এই কর্মযজ্ঞ দেখে মনে হচ্ছে
বাগান মালিকেরা ও সরকার এ বছর নতুন অারেকটি রেকর্ড গড়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু এতে শ্রমিকেরা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন কিংবা অামরা উদ্বিগ্ন হয়েছি। অার ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইনের কয়েকটি ধারায় নজর দিলে বিস্মিত হতে হয়।
শ্রম আইনের ১১৫ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কেবল মাত্র চা শ্রমিক ছাড়া সকল শ্রমিক ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি প্রাপ্য হবে।’ এই আইনের ১১৭ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘সকল শ্রমিক প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য এক দিন অর্জিত ছুটি প্রাপ্য হবে আর চা শ্রমিকেরা প্রতি ২২ দিনে এক দিন ছুটি প্রাপ্য হবে।’ শ্রম আইনের ৪৫ ধারায় উল্লিখিত প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা নারী চা শ্রমিকেরা অদ্যাবধি পায় নি। বরং ৪৫ ধারায় নারী চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বলা আছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে, চা-বাগান শ্রমিকের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চা-বাগানের চিকিৎসক কর্তৃক যতদিন পর্যন্ত সক্ষমতার সার্টিফিকেট পাওয়া যাইবে ততদিন পর্যন্ত উক্ত শ্রমিক হালকা ধরণের কাজ করিতে পারিবেন৷’
বৈষম্যমূলক এই আইন ২০০৬ সালে প্রনীত হবার পর কয়েকবার আইনটি সংশোধন হলেও চা শ্রমিকদের ভোট ব্যাংক বানিয়ে নির্বাচিত হওয়া কোনোও সংসদ সদস্য কিংবা জনপ্রতিনিধি এ ব্যাপারে কথা বলেনি। প্রত্যাশিতভাবে বর্তমান সরকারেরও ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজেই শ্রমিকদের জন্য এরূপ বৈষম্য খোদ শ্রম আইনে বিদ্যমান থাকায় এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কখনোই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় চা শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার সংগঠন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচিত নেতৃত্বও এ ব্যাপারে কোনো আন্দোলন করেনি। শ্রম আইনের ৯৫ (গ) ধারায় প্রতিটি চা বাগানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পন্থায় চা শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিটি চা বাগানে নামমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র যেখানে সকল রোগের ওষুধ প্যারাসিটামল। মৌলিক অধিকার আদায়ে ব্যার্থ চা শ্রমিক ইউনিয়নের গতিবিধি দেখেই বোঝা যায়, চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিশ্চিতভাবেই তাদের কোনোও ভাবনা নেই। এমনকি বর্তমান চরম সংকটময় সময়েও চা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে মজুরি সমেত ছুটির ব্যাপারেও তারা নির্লীপ্ত মনোভাব ব্যাক্ত করছেন। বারংবার শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণে ও যৌথ দরকষাকষিতে ব্যর্থ হয়ে বাগান মালিকদের লেজুরবৃত্তীয় চর্চায় নিমজ্জ্বিত বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন একটি অথর্ব এবং অমেরুদন্ডী প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে।
বর্তমানে এতো সস্তা মজুরীতে এতো দক্ষ শ্রমিক বিশ্বের কোথাও কোনো শিল্পেই নেই। তাছাড়াও চা চাষের বিরল কলাকৌশল চা জনগোষ্ঠী ছাড়া কেউ রপ্ত করতে পারবে না। অতএব কেবলমাত্র চা শিল্পেই চা শ্রমিকদের বিকল্প নেই। তাই চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। জন্মান্তর থেকেই তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা চা শ্রমিকদের দলবদ্ধ কাজের ক্ষেত্র কিংবা অস্বাস্থ্যকর শ্রমিক লাইনে ৭৫০ গজের আধাকাচা বাসায় একইসাথে যৌথ পরিবার ও গৃহপালিত প্রানীদের বসবাসের জায়গায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপ ধারন করতে পারে।
এমতাবস্থায় অবিলম্বে দেশের সকল চা শ্রমিককে মজুরি সমেত ছুটি দিতে হবে। সকল চা বাগানে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। আর বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় ব্যর্থ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বকে পদত্যাগ করতে হবে। শমশেরনগর চা বাগানসহ যে সকল চা বাগানে স্ব-প্রনোদিতভাবে শ্রমিকেরাই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে সেই সকল সংগ্রামী চা শ্রমিকদের অভিবাদন জানাই। দুনিয়ার মজদুর এক হও।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *